কালিয়াগঞ্জে অবৈধ কাঠমিলের রমরমা

111

অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ : আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবৈধ কাঠ চেরাই মিলের পীঠস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে কালিয়াগঞ্জ। শহর লাগোয়া গ্রামগুলিতে একের পর এক গজিয়ে উঠছে এই সমস্ত কাঠমিল। রমরমিয়ে চলছে ব্যবসা।

কালিয়াগঞ্জ ব্লকের ধনকৈল, সমসপুর রাস্তা, মোস্তাফানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের কুনোরগামী রাস্তা ছাড়াও শেরগ্রাম এলাকায় এমন অবৈধ কাঠমিলের দেখা মেলে। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে কীভাবে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন অবৈধ কারবারিরা? কীভাবে মিলছে বিদ্যুৎ সংযোগ? স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত, কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতি কীভাবে এদের অনুমোদন দিচ্ছে?  প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ, স্থানীয় বিট অফিসার, দমকল বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা বন দপ্তরের আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নানাবিধ টালবাহানায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত রায়গঞ্জের জেলা বন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ডি সিদ্ধার্থের মন্তব্য বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সুর মেলে।

- Advertisement -

উল্লেখ্য, এই কাঠমিলগুলি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। শয়িং, পিলিং এবং পেস্টিং। প্রতিটি ভাগে কাজ করার জন্য পৃথক পৃথক সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন। শয়িং মিলে মূলত কাঠ চেরাইয়ের কাজ হয়ে থাকে। পিলিং মিলে পাতা বের করার কাজ হয়। এছাড়া পেস্টিংয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিলে প্লাই নির্মাণের জন্য বোর্ড তৈরির কাজ হয়ে থাকে।

কালিয়াগঞ্জে হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত কাঠের মিল রয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রতিবছর লাইসেন্স নবীকরণ করতে একেকটি মিলের তিন থেকে চার লক্ষ টাকা খরচ হয়। জিএসটি, ইনকাম ট্যাক্স, মিলের লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, গ্রামের ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত ট্যাক্স, পঞ্চায়েত সমিতির লাইসেন্স নবীকরণ, ব্যবসায়িক লাইসেন্সের নবীকরণ করে কাঠমিল চালাতে হয়। অবৈধ কাঠমিলের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই দরকার পড়ে না। কালিয়াগঞ্জে বৈধ মিলের সংখ্যা কম থাকায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী চক্র। কিছু ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট লাইসেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন কাঠ সংক্রান্ত ব্যবসা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই করে চলেছেন অবৈধ কাঠমিলের ব্যবসায়ীরা। অনেক ক্ষেত্রে শুধু পিলিং মিলের লাইসেন্স থাকলেও চলছে পেস্টিংয়ে কাজ। কেউ আবার শয়িং মিলের লাইসেন্সের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছেন পিলিংয়ের কাজ।

কালিয়াগঞ্জের ভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের শেরগ্রাম এলাকার এমনই এক শয়িং মিলের মালিক গোপাল সাহা জানান, বন দপ্তরে শয়িং মিলের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা আছে। কিন্তু এখনও পাইনি। এক বছর হল লোকের জায়গা ভাড়া নিয়ে এই কাঠমিল চালিয়ে যাচ্ছি। বিনা লাইসেন্সে অনেকের মতো আমিও এই ব্যবসা করছি। এখনও পর্যন্ত প্রশাসনিক স্তরে কেউ কোনও বাধা দেয়নি। এভাবে ব্যবসা করা কি অবৈধ নয়? প্রশ্ন করতেই গোপালবাবু বলে ওঠেন, অবশ্যই। বন দপ্তরের আধিকারিকরা সামনের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু কোনওদিন কিছু বলেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালিয়াগঞ্জ উড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্যের কথায়, কালিয়াগঞ্জে মোট ছটি বৈধ মিল রয়েছে। কিন্তু ৫০টির ওপর উপরে অবৈধ কাঠমিলের ব্যবসা চলছে। মিল না চালালেও প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স, বিভিন্ন বিষয়ে নবীকরণে খরচ হয়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় চার লক্ষ টাকা। আমরা কয়েক বছর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। এই বিষয়টি আমাদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এটি সম্পূর্ণ বন দপ্তরের বিষয়। জানালেন কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি দীপা সরকার। তাঁর কথায়, কালিয়াগঞ্জে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাঠের মিল পাঁচ থেকে ছটি। বৈধ মিলের মালিকরা প্রত্যেকেই বছরান্তে লাইসেন্স নবীকরণ করেন। বন বিভাগ এই বিষয়ে কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির কোনও সাহায্য চাইলে আমরা সহযোগিতায় হাত বাড়াতে রাজি আছি।

এই বিষয়ে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক সৌমেন রায়। তাঁর বক্তব্য, যদি সত্যি অবৈধভাবে কেউ এই ব্যবসা করে থাকেন তাহলে অন্যায়। প্রশাসনের মদত ছাড়া বিনা লাইসেন্সে কাঠমিলে বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্ভব নয়। আগামীতে বন দপ্তরে বিষয়টি জানাব। তবে ঘটনা জানতে পেরে রায়গঞ্জ জেলা বন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ডি সিদ্ধার্থ জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলে তিনি প্রযোজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।