টাকা ছাড়া ট্রাকের চাকা ঘোরে না চ্যাংরাবান্ধায়

475
ছবি: গৌতম সরকার

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, চ্যাংরাবান্ধা : দাবিমতো টাকা না দিলে ট্রাকের চাকা ঘোরে না। তোলাবাজরা আঙুল না হেলানো পর্যন্ত সপ্তাহ পেরিয়ে মাস গড়ালেও বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ পাওয়া যায় না। কোচবিহারের চ্যাংরাবান্ধা আন্তর্জাতিক স্থলবন্দরে সিন্ডিকেটের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন ব্যবসাযীদের একাংশ। প্রশাসন বা পুলিশের কর্তারা নয়, কবে কটা পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকবে নিজেদের নিয়মেই তা ঠিক করে সিন্ডিকেটের চাঁইরা। তোলা আদায় করা ট্রাকের জন্য গোপন কোড যুক্ত চিরকুট ইস্যু করা হয়। তা দেখিয়ে স্পেশাল লাইনে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় ট্রাকগুলি। দুচার, দশ টাকা নয়, অভিযোগ, প্রতি ট্রিপে প্রতি ট্রাক থেকে আদায় করা হচ্ছে ২,৮০০ টাকা। অঙ্কের হিসেবে চ্যাংরাবান্ধা থেকে প্রতি মাসে ১ কোটি টাকারও বেশি আদায় করছে সিন্ডিকেট কারবারিরা। অভিযোগ, সেই টাকা ঢুকছে পুলিশ থেকে রাজনৈতিক নেতা- সবার পকেটে। আর যে কারণে সব জানা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা তোলাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যত কোনও পদক্ষেপই করছেন না প্রশাসন বা পুলিশের কর্তারা। সিন্ডিকেট রমরমায় চ্যাংরাবান্ধা উন্নয়ন পর্ষদের ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে নয়।

করোনা পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে সংখ্যা খানিকটা কমলেও সাধারণত চ্যাংরাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে দিনে গড়ে ৫০০টি পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এপার থেকে বোল্ডার রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও ভুট্টা, ভুসি সহ নানা সময় নানা ধরনের পণ্যও রপ্তানি করা হয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য নিয়ে বহু ট্রাক চ্যাংরাবান্ধায় আসে। ওই বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করে ভুটানও। বর্তমানে ভুটান থেকে বোল্ডার যাচ্ছে বাংলাদেশে। নিয়ম অনুসারে ১:১ অনুপাতে ভুটান ও ভারতের ট্রাক বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার কথা। সেক্ষেত্রে দিনে গড়ে ২৫০টি ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশে যায়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাণিজ্য চলে। মাঝে এক ঘণ্টা বিরতি বাদ দিলে গড়ে আট ঘণ্টা ধরে ট্রাক পারাপার হয়। অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারবারিরা অলিখিতভাবে যে ব্যবস্থা চালু করে রেখেছে তাতে প্রথম সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় চ্যাংরাবান্ধার স্থানীয় ট্রাক মালিকদের ট্রাক বাংলাদেশে ঢোকে। তারপর ঘণ্টা দেড়েক সময় দেওয়া হয় ডুয়ার্স থেকে আসা ট্রাকগুলিকে। সবশেষে অবশিষ্ট এক ঘণ্টা রাখা হয় স্থানীয় বা ডুয়ার্স থেকে আসা নয় এমন ট্রাকের জন্য। ২৫০টি ট্রাকের মধ্যে দিনে ১৯০-১৯৫টি ট্রাক ঢোকে স্থানীয় মালিকদের। ৪০-৪৫টি ট্রাক ঢোকে ডুয়ার্সের আর স্থানীয় বা ডুয়ার্সের নয় এমন মাত্র ১০-১৫টি ট্রাক বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ পায়। এরফলে স্থানীয় নয়, এমন ট্রাক ২০-২২ দিন পর ট্রিপের সুযোগ পায়। বোল্ডার নিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে টায়ার সহ ট্রাকের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন মালিকরা।

- Advertisement -

চ্যাংরাবান্ধার স্থানীয় ট্রাকগুলি থেকে তোলা আদায় করা হয় না। ডুয়ার্স এবং ডুয়ার্সের বাইরে থেকে যেসব ট্রাক আসে সেগুলি থেকেই ২,৮০০ টাকা করে নেওয়া হয়। স্থানীয় নয়, এমন ৫০-৬০টি ট্রাক প্রতিদিন বাংলাদেশে ঢোকে। তবে, প্রতিদিন ওই ক্যাটিগোরির গড়ে ১৫০টি ট্রাক চ্যাংরাবান্ধায় আসে। ফলে প্রতিদিন সিন্ডিকেটের গড় তোলাবাজির পরিমাণ ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। মাসে ২৬ দিন হিসাবে যা হয় ১ কোটি ৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার মুখে ভারত বা ভুটানের প্রতিটি ট্রাক থেকে তিনটি সংগঠনের নামে ৯০ টাকা করে আদায় করা হয়। মাসের হিসেবে সেই টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা। এসবের বাইরেও পার্কিংয়ের জন্য দিনের হিসাবে আলাদা টাকা দিতে হয়। মূলত চারজনের নেতত্বে পরিচালিত হচ্ছে সিন্ডিকেট। তাদের মধ্যে একজনের বাড়ি ডুয়ার্সে। বাকি তিনজন চ্যাংরাবান্ধার বাসিন্দা।

সিন্ডিকেটের পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক মদত। ফলে বাইপাস থেকে সার্ক রোড- সর্বত্র শেষ কথা বলে তারাই। সিন্ডিকেটের নিজস্ব বাহিনীও আছে। বাইপাস, সরকারি ট্রাক টার্মিনাস, ভিআইপি মোড়ে থাকে তাদের কড়া নজরদারি। তোলা জমা দেওয়ার গোপন চিরকূট ছাড়া সার্ক রোডে ঢুকলেই আটকে দেওয়া হয় ট্রাক। কথা না শুনলে চালকদের শারীরিক হেনস্তা করা হয় বলেও অভিযোগ। ডুয়ার্স বা ডুয়ার্সের বাইরে থেকে যত ট্রাক ঢোকে সকলকেই যেতে হয় চ্যাংরাবান্ধা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রাজারহাট এলাকায় থাকা একটি বেসরকারি ট্রাক টার্মিনাসে। সেখানেই তোলার টাকা জমা দিতে হয়। টাকা জমা পড়লে সেখান থেকেই তাদের বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ মেলার সম্ভাব্য তারিখ বলে দেওয়া হয়। সবাই সব জানলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারে না।