জঙ্গল সাফের জের, শেষ ৫০ বছরে ৬৮ শতাংশ বন্যপ্রাণ গায়েব

342

বার্ন ও লন্ডন : গত ৫০ বছরেরও কম সময়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গিয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ)। বন ধ্বংস, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের অতিরিক্ত শিকার বা মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে এজন্য দায়ী করেছেন গবেষকরা। গত ৫০ বছরে বিশ্বে বন্য প্রাণী কমেছে ৬৮ শতাংশ। পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, যেসব প্রাণী হ্রদ, নদী ও জলাভূমিতে বাস করে, বনজঙ্গল কেটে ফেলার ফলে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক গবেষকের কথায়, কিছু কিছু গোষ্ঠীর প্রাণীর অবস্থা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি খারাপ। এদের মধ্যে আফ্রিকার হাতি ও হাঙরের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

ডব্লিউডব্লিউএফের সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রকৃতি আর পরিবেশকে ধ্বংস করার জন্য এমনটা ঘটেছে। সভ্যতা যত এগিয়েছে, তত কাটা পড়েছে বনজঙ্গল। বন্যপ্রাণীদের নড়াচড়ার পরিসর কমে গিয়েছে। পরিবেশের পরিবর্তন এবং খাদ্যাভাবের ফলে হারিয়ে গিয়েছে বন্যপ্রাণীরা। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, এখন যে হারে মানুষ প্রকৃতি আর পরিবেশকে ধ্বংস করছে, তা আগে কখনও হয়নি। এই ধ্বংসলীলা যে খুব শীঘ্র কমবে, এমন কোনও লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না বলে রিপোর্টে উদ্বেগপ্রকাশ করা হয়েছে। আগামীকাল রাষ্ট্রসংঘেও এই রিপোর্ট জমা পড়বে বলে জানা গিয়েছে।

- Advertisement -

সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী তানিয়া স্টিলে বলেন, নির্বিচারে বনজঙ্গল সাফ করছি আমরা। বন পোড়াচ্ছি, বন কেটে বসতি বানাচ্ছি, নতুন নতুন শিল্পের জন্য গাছপালা কাটছি, সমুদ্র থেকে দেদার মাছ তুলছি এবং নোংরাও করছি যথেচ্ছ। আমাদের জন্য জল, জমি, বন-জঙ্গল কমে যাচ্ছে, নষ্টও হয়ে যাছে। এর তো একটা প্রতিক্রিয়া আছে। আমরা বুঝতে পারছি না যে, এর ফলে আমাদেরই নিরাপত্তা নষ্ট হচ্ছে। পৃথিবীর পরিবেশ পালটাতে পালটাতে এমন এক জায়গায় যাবে, যখন মানুষই আর এখানে বসবাস করতে পারবে না। সুখস্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে গিয়ে আমরা নিজেদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে ফেলছি। ১৯৭০ থেকে ২০১৬, এই পাঁচ দশকে বন্যপ্রাণের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে সংস্থা জানিয়েছে, স্তন্যপায়ী, পাখি, উভচর, মাছ ও সরীসৃপের ২০ হাজার প্রজাতির ৬৮ শতাংশই ইতিমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। সেই বিলুপ্তি সবচেয়ে বেশি হয়েছে ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত, এই দু’দশকে। তারপর নয়ের দশক থেকে গতি কিছুটা কমলেও সেই ধারাই মোটামুটি বজায় রয়েছে।

জুলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন (জেডএসএল)-এর সংরক্ষণ বিভাগের অধিকর্তা অ্যান্ড্রু টেরির কথায়, পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটলে পরিস্থিতি বদলাবে না। আর পরিস্থিতি না বদলালে এই প্রজাতিগুলি অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে পুরোপুরি মুছে যাবে। এর ফলে সার্বিক ভাবে ভেঙে পড়বে বাস্তুতন্ত্র, বেঁচে থাকার জন্য যার উপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। তিনি এও বলেছেন, বন্যপ্রাণীদের ধ্বংসের ওপর মানুষের অস্তিত্ব কতটা নির্ভরশীল, সাম্প্রতিক মহামারির ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রিপোর্টে এও জানিয়েছে, মানুষের অত্যাচারে ২০০০ সাল থেকে ১৯ লক্ষ মাইল ভূমি হারিয়ে গিয়েছে, যা গোটা ব্রিটেনের ৮ গুণ। ১০ লক্ষ বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে। ১৩০ কোটি টন খাদ্য ফিবছর নষ্ট হচ্ছে। যার ফলে এক লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন)-এর সমীক্ষা জানাচ্ছে, প্রাণী ও উদ্ভিদের ১ লক্ষ প্রজাতির মধ্যে ৩২ হাজার প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গিয়েছে।