পুর এলাকায় অপ্রতুল মা ও শিশুর টিকা, সিএমওএইচের হস্তক্ষেপ দাবি

716

রাজশ্রী প্রসাদ,পুরাতন মালদা: মা ও শিশুর টিকাকরণ প্রক্রিয়া ফের চালু হলেও পুরাতন মালদা পুর এলাকায় পর্যাপ্ত টিকা না থাকার অভিযোগে সরব হলেন বাসিন্দারা। টিকার অপ্রতুলতার ফলে পুর এলাকার মা ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বর্তমানে পুরসভার স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে সপ্তাহে দু’দিন টিকা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন মাত্র পনেরো থেকে কুড়িটি টিকা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এটা চাহিদার তুলনায় যথেষ্টই কম। পুর প্রশাসনকে জানিয়ে কোনও সুরাহা না হওয়ায় বিষয়টি লিখিতভাবে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে জানিয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ দাবি করলেন পুর এলাকার নাগরিকরা।

করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের জেরে প্রায় চার মাস বন্ধ ছিল মা ও শিশুদের জন্য জরুরি টিকাকরণ প্রক্রিয়া। যার ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের বিভিন্ন টিকাকরণের কাজ। টিকাকরণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছিল জেলার স্বাস্থ্যকর্তাদের। অবশেষে গত জুলাই মাস থেকে ফের টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু করার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য দপ্তর।

- Advertisement -

চার মাস বন্ধ থাকার ফলে জেলা জুড়ে যত টিকা বকেয়া পড়েছিল, তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ব্লক ও পঞ্চায়েত স্তরের স্বাস্থ্য আধিকারিক ও কর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন জেলার স্বাস্থ্যকর্তারা। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মা ও শিশুদের টিকাকরণের প্রক্রিয়া মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য দপ্তর। জুলাই থেকে টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু হলেও পুরাতন মালদা পুর এলাকায় টিকার অপ্রতুলতার জন্য গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের টিকাকরণ প্রক্রিয়া মার খাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট টিকাকরণের সময় পেরিয়ে গেলেও টিকা মিলছে না।

পুরসভার স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে সপ্তাহে মাত্র দু’দিন টিকা দেওয়া হচ্ছে। তাও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে প্রতিদিন টিকা পাচ্ছেন মাত্র পনেরো থেকে কুড়িজন মা ও শিশু। স্বভাবতই চার মাস ধরে যে মা ও শিশুরা টিকা পাননি, তাঁদের টিকার কাজ আরও পিছিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মা ও শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। পুরসভার স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, পুর এলাকার কুড়িটি ওয়ার্ডে নথিভুক্ত মা ও শিশুর (১৫ বছর পর্যন্ত) সংখ্যা প্রায় চৌদ্দ হাজার। করোনা পরিস্থিতিতে চলতি বছর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত টিকাকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বহু মা ও শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত থেকে গিয়েছেন। তবে সরকারি নির্দেশিকা মেনে জুলাই মাস থেকে ফের টিকাকরণ প্রক্রিয়া চালু হওয়ায় বকেয়া পড়ে থাকা টিকা দেওয়াটা একরকম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুর প্রশাসনের কাছে।

বর্তমানে পুরসভার ২০টি ওয়ার্ডকে চারটি জোনে ভাগ করে টিকাকরণ প্রক্রিয়া চলে। পাঁচটি করে ওয়ার্ড নিয়ে এক একটি জোন রয়েছে। প্রতিটি জোনের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সপ্তাহে দু’দিন মা ও শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ এক একটি কেন্দ্রে দৈনিক পনেরো থেকে কুড়িটির বেশি টিকা দেওয়া হয় না। অর্থাৎ দু’দিনে একটি কেন্দ্র থেকে তিরিশ থেকে চল্লিশ জন টিকা পান। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম বলে অভিযোগ। এর ফলে মা ও শিশুর বকেয়া টিকার পাহাড় জমছে বলে অভিযোগ উঠছে। টিকা না পেয়ে ইতিমধ্যেই পুরসভার জোনাল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন অনেকে। করোনার সময়ে এমনিতেই টিকার সময় পিছিয়ে গিয়েছে। চার মাস পরে টিকাকরণ শুরু হলেও যদি দ্রুত বাকি পড়ে থাকা টিকা না দেওয়া হয়, তবে মা ও শিশুর ভবিষ্যৎ সমস্যার মুখে পড়তে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুর প্রশাসনকে টিকাকরণের দিন ও টিকাদানের সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ করলেও কোনও সুরাহা হয়নি বলে অভিযোগ। তাই শুক্রবার এই সমস্যার কথা লিখিতভাবে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ভূষণ চক্রবর্তীকে জানান পুরাতন মালদা শহরের বাসিন্দারা।

অভিযোগকারী জয়ন্তী মণ্ডল, সোমনাথ প্রসাদ, অশোক নাথ, সুমন্ত দাসরা জানিয়েছেন, মা ও শিশুর টিকাকরণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না পুর স্বাস্থ্য প্রশাসন। সপ্তাহে মাত্র দু’দিন স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি থেকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। তাও প্রতিদিন মাত্র পনেরো থেকে কুড়িজনকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পুর এলাকায় প্রায় পাঁচশো টিকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। যে হারে পুর এলাকায় টিকাকরণ চলছে, তাতে ওই বকেয়া মেটাতেই আরও তিন মাস লেগে যাবে। ফলে নতুন যাঁরা টিকা পাবেন, তাঁরা আরও তিন মাস পিছিয়ে যাবেন। যদি স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি সপ্তাহে তিনদিন খোলা রেখে প্রতিটি কেন্দ্রে দৈনিক গড়ে পঞ্চাশজনের টিকাকরণ হয়, তবে সমস্যা মিটতে পারে। লিখিত অভিযোগ পেয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এদিকে এবিষয়ে পুরাতন মালদা পুরসভার স্বাস্থ্য বিষয়ক নোডাল অফিসার সাধন দাস জানান, করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় চার মাস টিকাকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। জুলাই থেকে তা ফের চালু হয়েছে। সরকারি নির্দেশ মেনেই সপ্তাহে দু’দিন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে টিকার কাজ চলছে। খুব বেশি বকেয়া টিকা নেই। দৈনিক মাত্র পনেরো থেকে কুড়িটি টিকা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকার জোগান স্বাভাবিক থাকলে বেশি সংখ্যায় টিকা দেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে পুরসভার কিছু করার থাকে না।

যদিও টিকার জোগান পর্যাপ্ত আছে বলে সাফ জানিয়েছেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ভূষণ চক্রবর্তী। এমন ঘটনার জন্য পুর স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিকল্পনার অভাবকেই দায়ী করেছেন তিনি। ভূষণবাবু জানান, মা ও শিশুর টিকার জোগানে কোনও খামতি নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। যদি কেউ বলে থাকেন টিকার জোগান নেই, তবে তা মিথ্যে কথা। সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে হয়। আগামী সোমবার পুরসভার স্বাস্থ্য আধিকারিকদের নিয়ে এজন্য বৈঠক ডেকেছি। সেখানেই তাঁদের বলে দেওয়া হবে, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এদিকে পুর এলাকায় অপ্রতুলতার কারণে টিকাকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ইতিমধ্যেই উদ্বেগ বাড়ছে শহরজুড়ে।