ব্রিসবেনের আকাশ থেকে চেন্নাইয়ের মাটিতে বিরাটরা

সঞ্জীবকুমার দত্ত, কলকাতা : বিশ্বরেকর্ডের স্বপ্ন নিয়ে দিনটা শুরু হয়েছিল।

চতুর্থ ইনিংসে রেকর্ড রানে মিরাকল জয়ের ভাবনায় মশগুল সমর্থকরাও। অক্সিজেন জোগাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আধা শক্তির ভারতীয় দলের লড়াই। যদিও সকালের সেশনেই আকাশ থেকে মাটিতে টিম ইন্ডিযা। ভেঙে খানখান প্রত্যাশার ফানুশ। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বিনা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ লজ্জার হার।

- Advertisement -

উইনিং টার্গেট ৪২০। ভারত সেখানে শেষ ১৯২-এ। পরাজয় ২২৭ রানের বিশাল ব্যবধানে। চার বছর পর ঘরের মাঠে প্রথম হার। বুমরাহ-র ক্যাচটা বাটলারের হাতে জমা পড়তেই সেলিব্রেশনে বুঁদ থ্রি লায়ন্স। সাজঘরে ব্যালকনিতে কোচ ক্রিস সিলভারউডের উচ্ছ্বাস। পাশে হতোদ্যম ভারতীয় শিবিরে হতাশার নানান দৃশ্যের কোলাজ।

পঞ্চম দিনে একপেশে ডুয়েলের লেখক জেমস অ্যান্ডারসন। চিপকে পঞ্চম দিনের পিচে স্পিনাররাই মূল অস্ত্র। অ্যান্ডারসন যদিও চেনা হিসেবটা উলটে দিলেন। পিচ নিয়ে হতাশ বুমরাহ বলেছিলেন, বলে থুতু লাগাতে না পারায় আরও বেশি অসহায় পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অ্যান্ডারসন কিন্তু ভুল প্রমাণ করলেন বুমরাহকেও। ২৫-২৬ ওভারের পুরোনো বলে রিভার্স সুইংয়ের ম্যাজিক করলেন।

প্রায ঘণ্টা খানেক অপেক্ষার পর এদিন বোলিংয়ের সুযোগ। আর্চার, লিচ, বেসদের দিয়ে ভারতকে ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন রুট। তবে দায়িত্বটা সামলালেন মধ্য আটত্রিশের চিরতরুণ অ্যান্ডারসনই। দ্বিতীয় বলটাই মিসাইল। জমে যাওয়া শুভমান গিলের (৫০) ডিফেন্স ভেঙে খানখান। কয়েক বল বাদে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। এবার ভাঙেন রাহানের (০) ডিফেন্স ও উইকেট। জোড়া রিভার্স সুইংয়ে পঞ্চম দিনে নিজের প্রথম ওভারে জোড়া শিকার। অ্যান্ডারসন পরে বলেন, জানতাম রিভার্স সুইং হবে। দরকার শুধু বলটা পারফেক্ট জায়গায় রাখা। আপাতত তিনদিনের বিশ্রাম। ফের ঝাঁপানো।

বিশ্বের একমাত্র পেসার যাঁর ঝোলায় ৬০০ উইকেট। অভিজ্ঞতার ধারটা টের পাইয়ে দিলেন অ্যান্ডারসন। কয়েক ওভার পর হার স্বীকার ঋষভেরও। এদিন জো রুট বলছিলেন, ঋষভ-ফ্যাক্টরের কারণে গতকাল ইনিংস ডিক্লেয়ার করতে পারেননি। কখন ঋষভ (১১) ঝড় ওঠে বলা মুশকিল। অ্যান্ডারসন যদিও সেই ঝড় ওঠার সুযোগ দেননি। ৫-৩-৬-৩, অ্যান্ডারসনের প্রথম স্পেলই কার্যত ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ঠিক হযে যায়। মুগ্ধ কেভিন পিটারসনও লেখেন, যেকোনও পরিস্থিতিতে নিজের সেরাটা দিতে হবে। জিমি ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছে।

অ্যান্ডারসনের তিন শিকারের আগে লিচের পকেটে চেতেশ্বর পূজারাও (১৫)। ঋষভ ফেরার পর বিরাটের (৭২) ব্যাটিংটুকু সরিয়ে রাখলে বলার মতো কিছু নেই। বরং অস্ট্রেলিয়া সফরে তৈরি লড়াইয়ের মিথটাই ক্রমশ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল জ্যাক লিচ (৭৬/৪), অ্যান্ডারসনদের (৩/১৭) সামনে।

সিডনিতে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট নিয়ে প্রায় ঘন্টা তিনেক ক্রিজে কাঁটিয়েছিলেন হনুমা বিহারী। ব্রিসবেনে শার্দূল-সুন্দর দেখিয়েছিলেন লড়াই কাকে বলে। এবং ঋষভ, শুভমানদের তারুণ্যের তেজ মহাকাব্য তৈরি। এদিন তার ছিঁটেফোটা পাওয়া গেল না। উলটে অসহায় আত্মসমর্পণে অধিনায়ক বিরাটকে হঠাও-এর ফিসফিসানি আরও জোরদার।

হাফডজন ব্যাটসম্যান ব্যর্থ দুই অঙ্কের স্কোরে পৌঁছোতে! কুড়ির বেশি রান শুধু শুভমান ও বিরাটের! স্পিনারদের ব্যর্থতা, দলের মানসিকতা বা প্রথম ইনিংসই ব্যবধান গড়ে দিল, ক্যাপ্টেন কোহলির কোনও অজুহাতে এর ব্যাখা দেওয়া মুশকিল। নিঃসন্দেহে বিশাল জয় ইংল্যান্ডের। প্রাক্তন ইংরেজ অধিনায়ক মাইকেল ভনের কথায়, ভারতের মাটিতে ভারতকে হারানো! দুর্দান্ত পারফরম্যান্স।

সিরিজে ১-০ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষেও পৌঁছে গেল ইংল্যান্ড। এবং তা ভারতকে সরিয়ে। একধাক্কায শীর্ষ থেকে বিরাটরা নেমে গেলেন চার নম্বরে। বাকি তিন ম্যাচে ঘুরে না দাঁড়াতে পারলে সিরিজের সঙ্গে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালও হাতছাড়া।

তিনদিনের ব্যবধানে চিপকেই দ্বিতীয টেস্ট। ভারতে এসে মাত্র দিন তিনেক অনুশীলন করার সুযোগ পেয়েছিলেন রুটরা। সেটাই যথেষ্ট। হোম অ্যাডভান্টেজ নিয়ে খেলতে নামা আত্মতুষ্ট বিরাটরা যা হাড়েহাড়ে টের পেল। উজ্জীবিত ইংল্যান্ড। দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের লড়াইটা আরও কঠিন করবে। ২০১২-র সফরে ইংল্যান্ড জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। বিরাটদের ফ্লপ শোয়ের পর সেই আশঙ্কাও অমূলক নয়।