অক্ষর-অশ্বীনের ঘূর্ণিতে সর্বনাশ ব্রিটিশ সিংহের

সঞ্জীবকুমার দত্ত, কলকাতা : পাঁচদিনের টেস্ট দুদিনেই শেষ!

সর্বসাকুল্যে ১৪০.২ ওভার! গোলাপি টেস্টের যবনিকা পতনে সেটাই যথেষ্ট। জ্যাক লিচ-জো রুটের স্পিনে ইংল্যান্ডের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন খানখান রবিচন্দ্রন অশ্বীন-অক্ষর প্যাটেলের ঘূর্নিতে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রানেই ইংল্যান্ডকে অলআউট করে জয় নিশ্চিত করে দেন স্পিন-যুগল। ৪৯ রানের জয়লক্ষ্যে কোনও ভুলচুক হয়নি রোহিত-গিলের।

- Advertisement -

অষ্টম ওভারের চতুর্থ বলে রুটকে রোহিত গ্যালারিতে ফেলতেই ম্যাচে ইতি। তখনও দিনের খেলা প্রায় একটা সেশন বাকি। ১০ উইকেটে গোলাপি টেস্ট জিতে সিরিজে ২-১ অ্যাডভান্টেজ। ম্যাচের সেরা অক্ষরের ম্যাচে ১১ উইকেট। ম্যাচে ৭ উইকেটের সুবাদে চতুর্থ ভারতীয় হিসেবে চারশোর মাইলস্টোনে অশ্বীন। সবকিছু ছাপিয়ে মোতেরার বাইশ গজ!

চিপকের দ্বিতীয় টেস্টের শুরু থেকে বল টার্ন করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গোলাপি টেস্টের বাইশ গজ সেই বিতর্ক আরও উসকে দিল। ভারতের দুরন্ত জয়ের মাঝেও যা কাঁটার মতো বিঁধছে। ব্র‌্যান্ড নিউ স্টেডিয়াম। দেশের মাটিতে দ্বিতীয় দিনরাতের টেস্ট। গত কয়েকদিন ধরেই উৎসবের মেজাজ মোতেরাকে ঘিরে। যদিও ব্যাট-বলের টক্করের আসল মঞ্চ বাইশ গজেই যেন সুরটা কাটল। র‌্যাংক টার্নার বানাতে গিয়ে ন্যূনতম ভারসাম্যের শর্তটাই ভুলে মেরে বসেছিলেন পিচ কিউরেটাররা। নিটফল, অক্ষর-অশ্বীনদের বোলিংকে কৃতিত্ব দিয়ে, বাইশ গজ নিয়ে তৈরি প্রশ্নটা আড়াল করা যাচ্ছে না।

গতকাল প্রথম দিনে পড়েছিল ১৩ উইকেট। আজ প্রথম দুই সেশনেই ১৭ জন প্যাভিলিয়নে! এরমধ্যে প্রথম সেশনে ভারত হারিয়ে বসে সাত উইকেট। ৯৯/৩ স্কোর থেকে খেলতে নেমে ১৪৫-এ শেষ। ৪৬ রানে শেষ সাত উইকেট। রোহিতের (৬৬) ইনিংসটুকু সরিয়ে রাখলে কোনও ব্যাটসম্যানই লিচ-রুটের স্পিন বুঝতে পারেননি! তাও আবার রুটের মতো অনিয়মিত স্পিনার কি না ৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট!

আসল ম্যাজিসিয়ান যেন মাঝের জমিটাই। সুনীল গাভাসকার তো বলেই দিলেন, বোলারদের কিছু করার প্রয়োজন নেই। বলটা সঠিক লাইন-লেংথে ফেললে, বাকি কাজটা করে দেবে পিচই। বিরাট কোহলি যদিও তা মানতে নারাজ। ম্যাচ জয়ের পর তাঁর দাবি, পিচ নয়, দুই দলের ব্যাটসম্যানরাই নিজেদের সঠিকভাবে মেলে ধরতে পারেননি। দুই দলই খারাপ ব্যাটিং করেছে।

৯৯/৩ স্কোরে যখন এদিন খেলতে নামেন রোহিত-রাহানে। ইংল্যান্ডের থেকে মাত্র ১৩ রানে পিছিয়ে। লিডটা ১২৫-১৫০ করতে পারলেই ম্যাচ নিশ্চিত। অথচ, প্রথম থেকে মোতেরার পিচে গোলাপি বল অন্য রং দেখালো। বল লাফাচ্ছে, টার্ন করছে। কোনওটা আবার পিচে পড়ে স্কিড করছে। ফল যা হওয়ার তাই। এক্ষেত্রে অক্ষর-অশ্বীনদের সঙ্গে কোনো তফাত্ খুঁজে পাওয়া গেল না লিচ-রুটদের। বিরাট, রোহিত, রাহানে, পুজারা- মূল চার উইকেটই লিচের ঝোলায়। বাকি পাঁচ রুটের।

৪২তম ওভারে প্রথম বল করতে আসেন। ভারতের স্কোর তখন ১১৭/৫। প্রথম বলেই ঋষভ আউট। পরের চারটিও রুটের (৫/৮) পকেটে। ক্রিকেট ইতিহাসে অধিনায়ক হিসেবে কৃপনতম পাঁচ উইকেটের নিরিখে দ্বিতীয়স্থানে রুট! এহেন বিস্ময়ে চাবিকাঠি বলুন না খলনায়ক, সবার আঙুল সেই পিচেই। মাত্র ৩৩ রানে এগিয়ে থেকে ভারত আউট ১৪৫-এ।

রুটকে সামনে রেখে ইনিংস ব্রেকে সাজঘরে ফেরা স্টোকস-বেয়ারস্টোরা তখন রীতিমতো চাঙা। ঘুরে দাঁড়ানোর গন্ধ পেয়ে গিয়েছেন। যদিও ফের ভুল। এবার ভুল প্রমাণ করে ছাড়লেন অক্ষর (৫/৩২)-অশ্বীন (৪/৪৮)। প্রথম ওভারেই জোড়া শিকার অক্ষরের। এরমধ্যে প্রথম বলেই জ্যাক ক্রলি (০) আউট। পরের বলে বেয়ারস্টোকেও পেয়ে গিয়েছিলেন। ডিআরএস নিয়ে বেঁচে যান। নাহলে দ্বিতীয় টেস্টেই হ্যাটট্রিকও (প্রথম ইনিংসে শেষ বলে উইকেট পেয়েছিলেন) সম্পন্ন হয়ে যেত। অবশ্য আক্ষেপ মুছলেন এক বল বাদেই বেয়ারস্টো-বধে।

বাকি সময়ে অক্ষরদের উচ্ছ্বাস আর ইংরেজ ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার দৃশ্য। রুট (১৯), স্টোকস (২৫), পোপ (১২)মাত্র তিনজন কোনওমতে দুই অঙ্কে পৌঁছোন। ফলস্বরূপ ভারতের বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন স্কোরের কলঙ্কে ৮১ রানেই শেষ ইংল্যান্ড। সবশেষে রুটদের লজ্জা বাড়িয়ে থ্রি লায়ন্সদের বিরুদ্ধে ১০ উইকেটের বৃহত্তম জয় বিরাটদের। সিরিজ ২-১। চতুর্থ টেস্টও (৪ মার্চ শুরু) আহমেদাবাদেই। ডে-ম্যাচ।

ইংল্যান্ডকে দুমড়ে দিয়ে অ্যাডভান্টেজ ভারত। অঘটন কিছু না ঘটলে, সিরিজ ও ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের টিকিট কার্যত নিশ্চিত।