অ্যাকাডেমির উন্নতির পক্ষে সওয়াল ফেরান্দোর

সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা : এই দেশে তিনিই প্রথম এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোনও দলকে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন। আপাতত স্পেনে নিজের বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছেন এফসি গোয়ার কোচ হুয়ান ফেরান্দো। সেখান থেকেই ভারতে কোচিং করাতে আসা থেকে লরা ব্লাঁর সঙ্গে ফতোরদায় দেখা হওয়া, সবরকম অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন উত্তরবঙ্গ সংবাদের পাঠকদের জন্য-

প্রশ্ন : ২০১৯-২০ মরশুমে এফসি গোয়ার পারফরমেন্স ছিল অসাধারন। এরকম একটা দলের দায়িত্ব নেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

- Advertisement -

ফেরান্দো : সত্যিই ওই মরশুমটা অসাধারন ছিল। লিগ-শিল্ড জেতায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ পায়। তার আগে সুপার কাপেও জেতে ওই দলটা। ফলে নতুন কোচ হিসাবে এসে আমার কাছে দলটাকে ভালো করে জানাই ছিল বড়ো চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া আগের দলটাও ভেঙ্গে যায়। একেবারেই নতুন দল তৈরি করতে হয়। আমার কাছে দলটাকে একসূত্রে গেঁথে ফেলাও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল।

প্রশ্ন : কীভাবে এখানকার ফুটবল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিলেন?

ফেরান্দো : খুবই কঠিন ছিল। আমার মানসিকতা এবং বেড়ে ওঠার জায়গা থেকে একেবারেই আলাদা পরিবেশ-পরিস্থিতি। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফুটবলারদের সঙ্গে, অধিনায়কের সঙ্গে কথাবার্তা বলি। ক্লাবের লোকজন, স্কাউটরা, সবাই আমাকে খুব সাহায্য করেছে কাজ করতে। তাছাড়া দিনের শেষে সবাই যখন এক লক্ষ্যে কাজ করতে চায়, তখন নতুন কারোর পক্ষেও ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়।

প্রশ্ন : ভারতে কাজ করার প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন হল?

ফেরান্দো : বেশ কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। প্রথমত ওই কড়া জৈব সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকা মোটেই সহজ কাজ নয়। হোটেলের মধ্যে সবসময় থাকতে হয়েছে। বাইরের লোকের মুখও দেখা যায়নি। হোটেল, ট্রেনিং গ্রাউন্ড, আর মাঠ, এই ছিল জীবন। তাছাড়া স্কোয়াড, ফুটবলাদের ভালো করে জানা-বোঝার ব্যাপারটা ছিল। প্রাক মরশুম প্রস্তুতির জন্যও সময় বেশি পাওয়া যায়নি। মাত্র দুটো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে টুর্নামেন্ট খেলতে নেমে পড়তে হয়। যত দিন গড়িয়েছে ফুটবলারদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। পরিবার, সন্তানদের থেকে দূরে ওভাবে বন্দী হয়ে থাকা কঠিন। তবে এরপরেও আমরা পরিবারের মতো থেকেছি। কীভাবে এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যেও পজেটিভ থাকতে হয়, হাসতে হয়, সেটাই ছিল বড়ো শিক্ষা।

প্রশ্ন : এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আর আইএসএলের মধ্যে পার্থক্য কি কি?

ফেরান্দো : প্রচুর পার্থক্য (হাসি)। খেলার ধরন, তীব্রতা, শারীরিক সক্ষমতা, ম্যাচের নিয়ন্ত্রন নেওয়ার দক্ষতা, প্রেসিং, পাসিং, পরিকল্পনা, পুরো ৯০ মিনিট মনসংযোগ ধরে রাখা, সবকিছুই অন্য উচ্চতার। আমাদের মতো দলের পক্ষে তাল মেলানোই মুশকিল। তবে অন্য উচ্চতার বলেই ম্যাচগুলো উপভোগ্য হয়।

প্রশ্ন : ভারতীয় ক্লাবগুলোর কোন কোন জায়গায় উন্নতি দরকার?

ফেরান্দো : অবশ্যই অ্যাকাডেমি। অনূর্ধ-১৬ বা ১৭ নয়, শুরু কতে হবে ১০ বছরের কম বয়স থেকে। তার জন্য ফেডারেশনেরও উদ্যোগী হওয়া দরকার। এই পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নশীপ চালু করতে হবে। ৫-৬ জন বিদেশি নিলেই উন্নতি হবে না। বরং অ্যাকাডেমি গড়ে তুললে উন্নতি হবে। হ্যাঁ অবশ্যই ভালো কোচ লাগবে এই অ্যাকাডেমিগুলোর জন্য। আপনি যদি ম্যাঞ্চেস্টার সিটি বা প্যারিস সাঁ জাঁর দিকে তাকান দেখবেন, ওরা প্রচুর ট্রফি জিতছে, কিন্তু তবুও অ্যাকাডেমির দিকে অসম্ভব নজর। কারণ ওটাই ক্লাবের ভবিষ্যৎ।

প্রশ্ন : পরের মরশুমের জন্য কি পরিকল্পনা?

ফেরান্দো : আমাকে আগে ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি এখনও জানি না, ওদের কি পরিকল্পনা। আইএসএল সেপ্টেম্বরে শুরু হবে শুনছি। আমাদের সব ভেন্যুতে সফর করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে একরকম পরিকল্পনা হবে। তবে শেষপর্যন্ত লক্ষ্য একটাই। ট্রফি জয়।

প্রশ্ন : ডুরান্ডের মতো টুর্নামেন্ট খেলতে চান প্রস্তুতি হিসাবে ?

ফেরান্দো : অবশ্যই। আমি প্রচুর টুর্নামেন্ট খেলতে চাই। কারণ আমার মতে, যত খেলবে ততই শিখবে। বাড়তি ট্রেনিং হবে। তাছাড়া সবাই সুযোগ পাবে খেলার।

প্রশ্ন : লরা ব্লাঁর সঙ্গে এখানে আপনার দেখা হল। নিজের আদর্শের সঙ্গে কথা বলে কেমন লাগলো?

ফেরান্দো : ২০ বছর আগে আমি যখন বাচ্চা ছেলে ছিলাম তখন বার্সেলোনার সিনিয়র দলে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। অদ্ভুত লাগছিল। ওঁকে দেখতাম, ওঁর মতো হতে চাইতাম। চাইতাম উনি আমাদের কোচ হবেন। পেশাদার ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম তো। আর দেখুন কোথায় দেখা হল, না ভারতবর্ষে। উনি কাতারের একটা দলের আর আমি এদেশের একটা দলের কোচ, কথা হল ফতোদায়। ওঁর সঙ্গে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে কথা হল। কাতার বিশ্বকাপে উনি ফ্রান্সের কোচ আর আমি ভারতের কোচ, আমাদের দেখা হচ্ছে ফাইনালে। এটাও আর একটা স্বপ্ন (হাসি)।