অসুস্থ হলে গন্তব্য বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার হাসপাতাল

159

পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি : কেউ রাতে হঠাৎ করে অসুস্থ হলে ভরসা বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার সরকারি হাসপাতাল। কারণ গ্রামের সরু রাস্তায় কাঁটাতারের গেট দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের আসার ব্যবস্থা নেই। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কাকুতিমিনতি করে রোগীকে কোলে করে গেট পেরিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে আসতে হয়। কিন্তু রোগী চরম অসুস্থ হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিষেবাই ভোটারদের একমাত্র ভরসা। জলপাইগুড়ি সদর বিধানসভা কেন্দ্রের দক্ষিণ বেরুবাড়ির ছিট সাকাতি গ্রামে ১৬৫ জন বাসিন্দার মধ্যে ৮১ জন ভোটার রয়েছেন। ভারতের মূল ভূখণ্ডের পাকা রাস্তার সামনেই ঝাপড়তলা বিএসএফের চৌকিতে ভারতীয় নাগরিকত্বের কোনও সচিত্র পরিচয়পত্র দেখালে তবেই গ্রামে ঢোকার জন্য বিএসএফ ৩ নম্বর গেট খুলে দেয়। এখানকার বাসিন্দারা এবারও ভোট দেবেন। কিন্তু ভোটের সময় বৃষ্টিতে কুড়ুম নদীর জল বাড়লে তাঁরা কীভাবে বিন্নাগুড়ি প্রাথমিক স্কুলের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসবেন, তা ভেবে এখানকার বাসিন্দাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

জলপাইগুড়ি জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় গ্রাম ছিট সাকাতি। মাত্র ২৬টি ঘরে প্রায় ১৬৫ জন মানুষের বসবাস। গ্রামে জমির পরিমাণ মাত্র ১৫৩ বিঘা। এমনিতেই ছিট সাকাতি গ্রাম কাঁটাতারের বেড়ার ভিতর বাংলাদেশের দিকে ভৌগোলিক দিক থেকে অবস্থিত। এদিকে, বর্তমানে গ্রামের মানুষ আপৎকালীন সমস্যায় যাতায়াত, চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপরেই নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে জরিপ কাজ করার পর ছিট সাকাতি গ্রামটি কার্যত কাঁটাতারের বেড়ার ঘেরাজালে চলে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন। কেউই খুব সহজে গ্রামে ঢুকতে পারবেন না। বিএসএফ ক্যাম্পে অনুমতি নিয়ে সীমান্তের গেট দিয়ে গ্রামে ঢোকার আগে নিজের পরিচয়পত্র জমা রাখতে হবে। জলপাইগুড়ি শহর থেকে কোচবিহারের হলদিবাড়ি দিয়ে দক্ষিণ বেরুবাড়ির মানিকগঞ্জের সাতকুড়া হয়ে ছিট সাকাতি গ্রামে পৌঁছাতে ৪৯ কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে হবে। দুই বছর আগেও সীমান্তের গেট পেরিয়ে কিছুটা হেঁটে সাঁকোবিহীন কুড়ুম নদীর এক হাঁটু জল পেরিয়ে এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে ছিট সাকাতি গ্রামে পৌঁছাতে হত। এখন নদীর ওপর কাঠের সেতু হওয়ায় সেই দুর্ভোগ নেই।

- Advertisement -

তবে নদীর পাড় ভাঙায় সেতুর পর কাঁচা সরু রাস্তা দিয়ে গ্রামে পৌঁছাতে গেলে সমস্যা হয়। ফলে এই অংশে এক গোড়ালি নদীর জল পেরোতে হয়। নদীর এই অংশের পাড় বোল্ডার দিয়ে বাঁধানো প্রয়োজন বলে স্থানীয় বাসিন্দা বাবলু সরকার জানান। ছিট সাকাতি গ্রাম কাঁটাতারের বেড়ার ভিতর কার্যত একটি বিচ্ছিন্ন গ্রাম। এই গ্রামের চারপাশে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার মুন্সিপাড়া, ভাটিয়াপাড়া, নেকিপাড়ার মতো গ্রাম রয়েছে। বাংলাদেশের এই সমস্ত গ্রাম ও ছিট সাকাতির মধ্যে কোনও কাঁটাতারের বেড়াজাল নেই। দুই দেশের বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, সমস্যা না থাকায় তাঁরা অনায়াসেই বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার নারায়ণপুর, মুন্সিপাড়া, বীরপাড়া, ভাটিয়াপাড়া ও বক্সিগঞ্জে হাটবাজার করতে যান। ছিট সাকাতির পুরুষদের অনেকেই বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ে করেছেন।

তবে এলাকায় সমস্যাও রয়েছে। ছিট সাকাতির অশীতিপর বাসিন্দা নুর রহমান সরকারের কথায়, আমাদের গ্রাম থেকে জলপাইগুড়ি সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। কোনও রোগীকে গ্রাম থেকে বের করে কুড়ুম নদীর সেতু পেরিয়ে সীমান্ত গেট দিয়ে জলপাইগুড়ির দিকে নিয়ে যাওয়াটাই বেশ সমস্যার। সমস্যা এড়াতে তাঁরা রোগীকে ১৪ কিলোমিটার দূরে থাকা বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো মনে করেন। এবারের বিধানসভা ভোট তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যাকে মেটাবে বলে নুর রহমানরা স্বপ্ন দেখছেন।