স্বনির্ভর হয়ে দিশা দেখাচ্ছেন চণ্ডীপুরের আদিবাসীরা

78

সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : আদিবাসী, নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে আসে ভারতের আদি জনগোষ্ঠীর ছবিটা- সততা, সরলতা আর জঙ্গল-গ্রামের জীবন। অভাব যাঁদের নিত্যসঙ্গী, তবু মুখে হাসির ঝলক তাঁদের জীবনযাত্রার আলাদা রূপটা তুলে ধরে শহুরে জনমানসের সামনে। পিছিয়ে পড়ার তকমাটাও কোনও কোনও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। তবে এসব ধারণা পালটে, পিছিয়ে পড়ার তকমা ঘুচিয়ে চণ্ডীপুরের আদিবাসীরা আজ স্বনির্ভর। শহুরে মানুষের চোখে আদিবাসীদের যে সংজ্ঞাটা জ্বলজ্বল করে, সেই ছবিটাই আমূল পালটে ফেলেছেন কুশমণ্ডির চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা মনসা টুডু, রেস্কা হেমব্রমরা।

কুশমণ্ডি সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আয়রা ফরেস্ট, বিএসএফ ক্যাম্প পেরিয়ে আরও কিছুটা দূরে সীমান্ত ঘেঁষে একটি শান্ত গ্রামের নাম হল চণ্ডীপুর। ১৫ বছর আগের চণ্ডীপুর আর আজকের চণ্ডীপুরের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। আর এই ফারাকটা তৈরি করেছেন বুধন হেমব্রম, শুকলাল বাস্কে, মনসা টুডুর মতো নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মের মানুষজন। একসময় সীমান্তের চোরাকারবারিরা অবৈধ কাজে এখানকার সহজ সরল মানুষদের ফাঁসিয়ে দিত। এখানকার বাসিন্দাদের সন্দেহের চোখে দেখত বিএসএফ। সংসারের চাকা ঘোরাতে  এই এলাকার বহু ছেলে গ্রাম ছেড়ে ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে পাড়ি জমাতেন। পিছিয়ে পড়া চণ্ডীপুরের পটপরিবর্তনের শুরু ২০০০ সাল থেকে। বুধন হেমব্রমের কথায়,এক সময় আমাদের গ্রামে কোনও স্কুলই ছিল না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চণ্ডীপুরে একটি এমএসকে ও পাশের আরেকটি আদিবাসীপাড়ায় শিশুশিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা গিয়েছে।

- Advertisement -

কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে অনেকের জমি থাকলেও ভালোমতো চাষাবাদ করতে পারতেন না চণ্ডীপুরের আদিবাসীরা। বিএসএফের নিয়মের জাঁতাকলে ফসল ফলিয়ে পাকা ফসল কেটে নিয়ে যেত বাংলাদেশিরা। সেই অত্যাচার এখন অনেকটাই কমেছে। শুকলাল বাস্কে জানান,ডাইনি প্রথার অবসান হয়েছে। ঝাড়ফুঁকের মতো কুসংস্কারও এখন আর গ্রামের কাউকে প্রভাবিত করে না। গ্রামের পুকুরগুলোকে সংস্কার করে পঞ্চায়েতের উদ্যোগে শুরু হয় মাছ চাষ। অনাবাদি পুকুরপাড়ের শক্ত রুক্ষ মাটি কেটে ফলের ও অন্যান্য গাছ বসানো হয়েছে। ২২০টি পরিবার নিয়ে চণ্ডীপুর গ্রামের সকলেই আলাদা আলাদা স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে যুক্ত রয়েছেন।

আদিবাসী সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারে চর্চা শুরু হয়েছে গ্রামেই। ২০১১ সালের পর থেকে চণ্ডীপুর বদলে যেতে শুরু করে। রাজ্য সরকারের লোকপ্রসার প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের ৫৮ জন নৃত্যশিল্পী। আদিবাসী নৃত্যে চণ্ডীপুরের শিল্পীদের খ্যাতি এখন উত্তরবঙ্গজুড়ে ছড়িয়েছে। প্রশংসা করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁরই নির্দেশে চণ্ডীপুর আদিবাসী সমাজ ও লোকসংস্কৃতি কল্যাণ মঞ্চ পেয়েছে অত্যাধুনিক দুটি হারমোনিয়াম। আদিবাসী ভাষায় প্রতি বছর নতুন নতুন নাটক মঞ্চায়নে উপস্থাপন করে চণ্ডীপুরের শিল্পীরা অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন গৌড়বঙ্গের বিভিন্ন আদিবাসী নাট্যদলকে। এই সাফল্যের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে নামভৈল, বারোঘরিয়া, বেসাতিপাড়া, মৌলাই, মানিকোর, মালিগাঁও, কাটাসন, সামপুর, জাহেরপুর, ভক্তিপুরের মতো এলাকাতেও।

ইন্দিরা আবাস, বাংলা আবাস যোজনায় প্রায় দেড়শো পরিবার  পাকাবাড়ি পেয়েছে। আদিবাসী সংস্কৃতিকে উত্সাহ দিতে মৎস্য দপ্তরের উদ্যোগে গ্রামেই তৈরি হয়েছে কমিউনিটি হল । এখন আর ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার হিড়িক নেই। একশো দিনের কাজ না হলে মাছ ধরা, নয়তো হাঁস-মুরগি পালন, কোনও না কোনও কাজের সঙ্গে সকলেই যুক্ত আছেন।

স্কুলছুট আটকাতে সিধো-কানহো কল্যাণ সংঘ ফ্রি কোচিং সেন্টার চালানোর ভার নিয়েছেন রাজেন টুডু, রাজেশ মুর্মুরা। জেলাজুড়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঞ্ঝিহাড়াম প্রথাকে চালু করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে চণ্ডীপুর গ্রাম থেকেই। জগমাঝি সোম সোরেন বলেন,দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নিজেদের কুসংস্কারমুক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই চালাচ্ছেন চণ্ডীপুরের বাসিন্দারা। চণ্ডীপুর যে দিশা দেখাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।