সংক্রামিতরা অচ্ছুত নন মুনমুনের কাছে

ভাস্কর বাগচী, শিলিগুড়ি : গায়ে অনেকটা পিপিই কিটের মতো দেখতে একটি রেইনকোট। তার উপর চাপানো হলুদ রংয়ে হাফ জ্যাকেট। মুখে মাস্ক। বাহন বলতে অনেকটা অটোর মতো দেখতে একটি টোটো। সেটি নিয়ে শিলিগুড়ি শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিপদবন্ধু মুনমুন সরকার।

স্রেফ করোনা শব্দটি শুনলেই বাকিদের মধ্যে যেখানে পালাই পালাই রব, সেখানে করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়া কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বা করোনা জয়ী কাউকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে শক্তিগড়ের মধ্য চল্লিশের মুনমুনই ভরসা। টোটো চালানোটা তাঁর পেশা। কিন্তু করোনাজড়িত কাউকে টোটোয় চাপানোর বিনিময়ে একটি পয়সাও নেন না। তাঁর এহেন কীর্তিকে প্রথম প্রথম অনেকে অন্য নজরে দেখলেও আজকাল রীতিমতো সেলাম ঠুকছেন। শুধুই কি তাই? করোনায় সংক্রমণের হার যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি, সেখানে গিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন শিলিগুড়ির প্রথম এই মহিলা টোটোচালক। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার প্রথম দিন থেকেই মুনমুনদেবীর বক্তব্য, করোনা সংক্রামিত যে কাউকে যখন-তখন হাসপাতালে পৌঁছে দিতে আমি প্রস্তত। করোনা মানেই যে মৃত্যু নয়, তা প্রমাণ করতে চাই। পাশাপাশি, এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়াও যে কাজের কথা নয় তাও সবাইকে বোঝাতে চাই।

- Advertisement -

সংসারে সেই অর্থে আর্থিক টানাটানি ছিল না। ছিল শুধুমাত্র নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজের পরিচয় সৃষ্টির প্রাণপণ চেষ্টা। তাঁকে দেখে যাতে আরও অনেক মহিলা এই পেশায় এসে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ছয় বছর আগে টোটো নিয়ে মুনমুন একদিন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। এখন শুনতে সহজ লাগলেও সেদিন আদতে কাজটি তেমন ছিল না মোটেই। প্রথম প্রথম বহু উপহাস, ঠাট্টা-টিটকিরি সহ্য করতে হয়েছে। সহ্য করতে হয়েছে পদে পদে মানসিক নির্যাতন। কিন্তু মনের অদম্য জেদটাই মুনমুনের রক্ষাকবচ। তাই তাঁকে দেখেই শিলিগুড়ি শহরে প্রায় ৮০ জন মহিলা টোটো চালানোকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রথম মহিলা টোটোচালক হিসাবে তাঁর পরিচিতি এতটাই যে, আইন ভাঙার অভিযোগে পুলিশ কোনও টোটোচালককে ধরলে প্রথম ফোনটি মুনমুনের কাছেই যায়। মুনমুনই শহরের একমাত্র টোটোচালক যাঁর নিজস্ব কোনও রুট নেই। শহরের যে প্রান্তে যেতে চান, অবাধে সেখানেই যেতে পারেন। শুধু টোটো চালানোই নয়, ইউনিক ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্য হিসাবে দিনের একটি সময় তিনি মানবসেবার কাজে লাগান।

কাওয়াখালির কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসার পর করোনাকে জয় করে শিউলি চক্রবর্তী সুস্থ হয়ে ওঠেন। এত কঠিন একটি যুদ্ধে জিতলেও বাড়ি ফেরার জন্য কোনও গাড়ি পাচ্ছিলেন না। করোনা হয়েছিল শুনেই কেউই শিউলিদেবীকে গাড়িতে তুলতে রাজি হচ্ছিলেন না। এই সময়ই শিউলিদেবীর ছেলের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান মুশকিল আসান মুনমুন। উচ্ছ্বসিত শিউলিদেবী। বলছেন, অ্যাম্বুল্যান্সচালকরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি না হলেও মুনমুন সেই কাজটি স্বেচ্ছায় করে দিলেন। বিনিময়ে একটি টাকাও ভাড়া নিলেন না। ওঁর জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। শুনে সলজ্জ মুনমুন বলছেন, পুরুষদের তুলনায় আমরা মহিলারা যে কোনও অংশে পিছিয়ে নই তা প্রমাণ করতে চাই এভাবেই।