গ্রামে ঘুরেছেন, পিকনিক করেছেন সংক্রামিত শ্রমিক

রেজাউল হক, পুরাতন মালদা : ভিনরাজ্য ফেরত এক শ্রমিকের লালার নমুনা সংগ্রহ করে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নমুনা সংগ্রহের ১১ দিন পর ওই শ্রমিকের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। কিন্তু ততদিনে ওই শ্রমিক গোটা গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মিশেছেন অনেকের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরাতন মালদা ব্লকের সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চর কাদিরপুর এলাকায় ওই শ্রমিকের শরীরে সংক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তার ওপর সংক্রামিতকে কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যেতে গ্রামে পুলিশ, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের টিম পৌঁছায়। তাতেই আরও হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে যায়।

এই ঘটনায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগে অসন্তোষ ছড়াতে শুরু করে এলাকার গ্রামবাসীদের মধ্যে। গ্রামবাসীদের প্রশ্ন, ভিনরাজ্য ফেরত ওই শ্রমিকের লালার নমুনা সংগ্রহ করার পর কেন তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? কেন তাঁকে তখন কোয়ারান্টিন সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি? ওই শ্রমিক গ্রামে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করেছেন। বাড়ির লোকদের সঙ্গে মিশেছেন। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, এর প্রভাব নিশ্চিতভাবে গোটা গ্রামে পড়বে। এখন ওই শ্রমিকের করোনা ধরা পড়েছে। গ্রামের সবাই আতঙ্কিত। প্রশাসনের এই ধরনের কাজকর্ম কখনই মেনে নেওয়া যায় না। এদিন সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ, প্রশাসনের কর্তাদের সামনেও একপ্রকার বিক্ষোভ দেখান গ্রামবাসীরা।

- Advertisement -

এনিয়ে ব্লক প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চর কাদিরপুর এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য সুভাষ মণ্ডল বলেন, প্রশাসন এমন উদাসীন হলে মানুষ সংক্রামিত হবেই। ১১ দিন আগে ভিনরাজ্য থেকে ফেরা এক শ্রমিকের নমুনা সংগ্রহ করা হল। লালা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হল। এখন করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পেয়ে ওই শ্রমিককে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে এসেছেন স্বাস্থ্য দপ্তরের লোকজন। কিন্তু এতদিনে ওই শ্রমিকের মাধ্যমে গ্রামে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। কেন এভাবে উদাসীন মনোভাব দেখিয়ে শ্রমিকদের লালার নমুনা নেওয়া ও পরীক্ষা করা হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। এমন চলতে থাকলে এই মারণ ভাইরাস হুহু করে বাড়বে।

এদিকে সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েত ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গুজরাট ফেরত ওই শ্রমিক ১ জুন মালদায় আসেন। গুজরাট থেকে সরকারিভাবে বাসে করে ফেরার পর মালদা শহরের গৌড়কন্যা বাস টার্মিনাসে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁরও লালার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর তাঁকে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। বাড়িতে এসে যথারীতি তিনি পরিবারের লোকেদের সঙ্গে ওঠাবসা করেছেন। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে পিকনিক করেছেন। চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছেন। তার ১১ দিন পর ওই শ্রমিকের লালায় করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেল। এতেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে।

করোনা সংক্রামিত ওই শ্রমিকের স্ত্রী বলেন, প্রশাসন তো দায়সারা কাজ করে স্বামীকে ছেড়ে দিল। বাড়ি আসার পর আমরা স্বামীকে বাড়িতে ঢুকতে দিইনি। বাড়ির সামনে আমবাগানে পলিথিন টাঙিয়ে থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু ও বেশিদিন ওখানে থাকেনি। স্বামী সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে খাবার খেয়েছেন। পরে আমাদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গেও মেলামেশা করেন। তারপরেই এদিন পুলিশ, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা স্বামীর করোনা সংক্রমণের রিপোর্ট নিয়ে গ্রামে আসেন। আমাদের এখন কী হবে! বাড়িতে আটজন সদস্য রয়েছে। তার মধ্যে শিশুও রয়েছে। প্রশাসনের তরফে আমাদের স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলে কোয়ারান্টিন সেন্টার করে থাকতে বলা হয়েছে ।

আক্রান্ত ওই শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, প্রশাসনের উদাসীনতায় একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। প্রশাসন যদি প্রথম থেকেই কোয়ারান্টিন সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো কাউকে দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়তে হত না। পরিবারের লোকেরা সবাই ওই শ্রমিকের সঙ্গে মিশেছে। গ্রামবাসীদের অনেকেও তাঁর সঙ্গে মেলামেশা করেছেন। যদিও এদিন পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে ওই শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের কোয়ারান্টিন সেন্টারে থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে এখনও কারোর লালার নমুনা নেওয়া হয়নি।