শতবর্ষে হেমন্ত ও নব্য ‘বাল্মিকী প্রতিভা’

700

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: সাল ১৯৭৯, লন্ডন। প্রবাসী ভারতীয়দের ডাকে অনুষ্ঠান করতে সেই বছর লন্ডনে হাজির হয়েছেন হেমন্ত। কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এই শহর, সেই শহর মিলিয়ে বেশ ক’টি অনুষ্ঠান। অল্প কিছুদিন কাটিয়ে তারপর দেশে ফেরা। ছোটখাটো সফরে আঁটোসাঁটো ‘শিডিউল’।

অনুষ্ঠানের মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন জিতেন্দ্র আর্য। হেমন্তের বিশেষ গুণগ্রাহী, প্রকাণ্ড ভক্ত। পেশায় ইমপ্রেসারিও, জিতেন্দ্র আর্য বম্বের কোলাবায় অবস্থিত রাম ইম্প্রেসারিজ লিমিটেড নামক বিখ্যাত সংস্থার কর্ণধার। লন্ডনে ব্রডওয়ে, সাউথহলেও ছিল তার অফিস। ব্যবসার সঙ্গেই আধ্যাত্মিকতা এবং সঙ্গীত নিয়ে রীতিমতো চর্চা করতেন আর্য।

- Advertisement -

মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ‘রামভক্ত’ এই মানুষটির মুখে সারাক্ষণ লেগে থাকত হয় ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি, না হয় হেমন্তের গাওয়া কোনও গান। এতটাই হেমন্ত অনুরাগী তিনি। প্রিয় শিল্পী লন্ডনে এসেছেন শুনে ছুটে এসেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। সঙ্গে নিয়ে এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব।

লন্ডনেই ‘পলিডর’ নামের একটি রেকর্ড কোম্পানি খুলতে চলেছেন জিতেন্দ্র আর্য। প্রথম রেকর্ড’টি তিনি তাঁর আরাধ্য ‘দাদা’কে দিয়ে করাতে চান। কোনও ফিল্ম সং বা আধুনিক গান নয়, নির্ভেজাল ভজন, বাল্মিকীর ভজন। আর্য ছিলেন বাল্মিকী সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই চান রামায়ণ প্রণেতার দোঁহা ও ভজন নিয়েই প্রথম সে রেকর্ড’টি বের করতে। সুন্দর প্রস্তাব। রবি ঠাকুরের ‘বাল্মিকী প্রতিভা’র কথা মনে পড়ে যায় হেমন্ত’র। আর্য চান হেমন্তের সুরে নতুন করে গাওয়া হোক এই ভজন। এবার আকাশ থেকে পড়লেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তা কি করে সম্ভব?

প্রবাসীদের অনুরোধে অনুষ্ঠান করতেই তাঁর লন্ডন আসা। টাইট শিডিউল। অল্প কয়েকদিনের সফর। তারপর দেশে ফেরা। এত অল্প সময়ে একটা গোটা অ্যালবাম পরিচালনা করা চাট্টিখানি কথা নয়। বেজায় ফাঁপরে পড়েন তিনি। ফিরিয়ে দিতে চান প্রস্তাব। কিন্তু জিতেন্দ্র নাছোড়বান্দা। অ্যালবাম যদি হয় তবে তা ‘হেমন্ত দাদা’ই করবেন, অন্য কেউ নন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, হেমন্ত ছাড়া অন্য কেউ’ই এই প্রজেক্টের কদর বুঝবেন না। আর হেমন্তের ভজন মানেই তা কিন্তু জলজ্যান্ত ইতিহাস। আরাধ্যের সামনে নতজানু হয়ে দু’হাত জড়িয়ে অনুরোধ করেন আর্য। এবার আর না বলতে পারেননি হেমন্ত। ভক্তের ডাক ভগবানও ফেরাতে পারেন না।

হেমন্ত সরস্বতীর সাক্ষাৎ মানসপুত্র। রাজি হয়েছিলেন ‘বাল্মিকী প্রতিভা’র এই নব্য সংস্করণে সুর দিতে। বাকিটা ইতিহাস। সে বছরই ‘পলিডর’ কোম্পানি থেকে বেরল ৬টি গানের এক অসামান্য গীতি আলেখ্য-‘বাল্মিকী’। বাল্মিকীর দোঁহা, ভজন ও ‘রামায়ণী কথা’ নিয়ে ৪৮ মিনিটের সুদীর্ঘ লং প্লেয়িং। বাল্মিকপন্থী গুরু জ্ঞাননাথজি, স্বামী গৌরী শঙ্কর আচার্য, ধর্মেন্দ্র গৌতম, বলদেব মোহন মেহতা, শ্যাম সাগর এবং বিমল ভারতেন্দুর কলমে সুর প্রতিস্থাপন করেন হেমন্ত মুখার্জি। গোটা অ্যালবামে সুর দেওয়ার পাশাপাশি তিনটি অসাধারণ ভজন – ‘প্রথম ম্যায় বন্দনা রচনা করু’, ‘জয় জয় বাল্মিকী’ ও অতি শ্রুতিশ্রাব্য ‘অরদাস’এ স্বয়ং কন্ঠদান করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

অন্য আরেক ভজন ‘আও আও সব ভাই’তে কন্যা রানু মুখার্জির সঙ্গে তিনি ডুয়েটও করেন। বাকি গান’গুলি পরম মমতায় গেয়েছিলেন হেমন্ত-স্নেহধন্যা হৈমন্তী শুক্লা এবং শিল্পী সেনের মত গায়িকারা। লন্ডনেই রেকর্ড হয়েছিল এই অ্যালবাম’টি। রাগপ্রধান সেই গানগুলি শুনে চোখে জল আর্য সাহেবের। হেমন্তের দু’হাত জড়িয়ে বলেছিলেন, “আপ ইনসান নেহি। ভগবান হ্যায়। ইয়ে রামজি কা হি ইচ্ছা হ্যায় যো আপসে ইয়ে পুজা করওয়া প্রভু নে।” নিজেও আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন হেমন্ত। দু’হাতে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁকে। শোনা যায় এই অ্যালবামটির জন্য একটি টাকাও পারিশ্রমিক নেননি তিনি।

শুধু বিদেশে নয়, স্বদেশেও অভাবনীয় সাড়া পায় হেমন্তের নব্য ‘বাল্মিকী’ প্রতিভা। জিতেন্দ্র আর্য সাহেবের রাম ইম্প্রেসারিও বের করেছিল এর স্বদেশী ভার্সান। পরে আশির দশকে ‘ত্রিকালদর্শী আদিগুরু বাল্মিকীজি মহারাজ’ নামের একটি আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে হেমন্তের এই কম্পোজিশন ব্যবহৃত হয়। ধর্ম-বর্ণ-জাতির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা পায় এই বাল্মিকী ভজন। সেই ভজন, যার নেপথ্যে কোথাও না কোথাও রয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মিকী প্রতিভা’র প্রভাব। সেই অনুপ্রেরণার কথা স্বীকারও করেছিলেন হেমন্ত পরবর্তীকালে। বাল্মিকী দোঁহা ও অশ্রুত রামায়ণী কথার এমন অনবদ্য সম্মিলনী, এমন ‘ব্যারিটোনিক’ সুরেলা সফর অথচ কালের অমোঘ নিয়মে কোথায় যেন নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে সেই অসাধারণ কীর্তি। খুব কম মানুষই এই অসামান্য সংকলনটির কথা মনে রেখেছেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আজও এক অনন্ত বিস্ময়। অনাদি-অন্ত তাঁর ব্যাপ্তি, গভীরতা। ১৯২০ সালে ১৬ জুন পুণ্যতীর্থ কাশী থেকে শুরু হয়েছিল যে পথচলা আজও তা শাশ্বত। ভারতীয় লঘু, সিনে সঙ্গীতের দুনিয়ায় তাঁর অবিসংবাদী অবদানকে নিয়ে আজও, একশো বছর পার করে চলছে সমান গবেষণা। উঠে আসছে কত অবিস্মরণীয় তথ্য ও ইতিহাস। তবু হেমন্তের বুঝি তল মেলা ভার। বাংলা তথা ভারতীয় সঙ্গীতের উজ্জ্বল সূর্য তিনি, যার সুরের আলোয় উদ্ভাসিত আমাদের সাঙ্গীতিক চেতনা। অথচ কতটুকুই বা চিনতে পেরেছি তাঁকে আমরা? শতবর্ষ পার করে তিনি আজও এক অপার, অনন্ত বিস্ময়।

প্রথম গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার মল্লিকাবনে’ থেকে বাংলাদেশে রেকর্ড করা শেষতম আধুনিক গান, হিন্দি, বাংলা ও অন্যান্য আঞ্চলিক সিনেমা জগতে হাজারেরও বেশি প্লে ব্যাক, পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে গাওয়া প্রথম গান, পণ্ডিত রবিশঙ্করের পর হলিউডে দ্বিতীয় ভারতীয় সঙ্গীতকার রূপে সুরারোপন, আফ্রিকার মাটিতে প্রথম ভারতীয় সুরকার রূপে জাতীয় নায়কের মর্যাদা পাওয়া, ভারত সরকারের দেয়া পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণের মত সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া…এমন বহু বহু কিংবদন্তি আখ্যান রয়েছে তাঁকে ঘিরে।

লতা মঙ্গেশকর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “হেমন্তদার গান শুনে মনে হয় মন্দিরে বসে কোনও সন্ন্যাসী বুঝি সুরের অর্ঘ্য দিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করছেন।” এটাই হেমন্ত। ভারতীয় সঙ্গীতের চির হেমন্তকাল। তিনি গেয়েছিলেন, “আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শোনো, আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে”… ঋতুর মতই হেমন্তও ফিরে ফিরে আসেন। শততম বর্ষ পেরিয়ে আজও তিনি সমান উজ্জ্বল, সমান প্রাসঙ্গিক।

হেমন্তের ক্ষয় নেই। হেমন্তের শেষ নেই কোনও। সুরের আকাশে তিনি এক অবিনশ্বর শুকতারা। একশো বসন্ত পেরিয়ে এসেও সেই তারা’টি অমর অক্ষয় শাশ্বত চিরকালীন…

ঋণ স্বীকার:

১. সুখেন্দুশেখর রায়, রাজ্যসভার সাংসদ
২. জয়দীপ চক্রবর্তী, বিশিষ্ট হেমন্ত গবেষক ও অধ্যাপক