কোরক হোমের নাবালকদের লেখায় রুঢ় বাস্তব

101

পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি : দুই নাতির মধ্যে দিদা ভালোবাসত খালি ছোট নাতিকে। বড় ভাই যা-ই করুক না কেন, কিছুতেই দিদার সেই আদর পেত না সে। বরং কথায় কথায়, নানা ছুতোনাতায় মার খেতে হত দিদার হাতে। একসময় বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসে বড় ভাই।

এই গল্পটাই এবার প্রকাশ পাচ্ছে কোরকের শারদীয়া সংখ্যায়। তবে এই গল্প কোনও প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক লেখেননি। এমনকি সাহিত্য যশোপ্রার্থী কোনও গল্পকারের রচনাও নয় এটা। একেবারেই অল্পবয়সি কাঁচা হাতের লেখা। তবে এটা মনগড়া কাহিনীও নয়। একেবারেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা কাহিনী। লেখক জলপাইগুড়ির কোরক হোমেরই বাসিন্দা।

- Advertisement -

পুজো সংখ্যা মানেই বিশিষ্ট লেখকদের লেখা সংবলিত কোনও বই। যদিও কোরকের এই পুজো সংখ্যা সাধারণ পুজো সংখ্যার মতো নয়। এখানে যারা লিখেছে, তারা কেউ নামকরা লেখক নয়। তাদের সকলেরই বযস ১৮ বছরের নীচে। কারও বাড়ি এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। কারও বাড়ি অসম, ত্রিপুরা, বিহার, নেপাল বা বাংলাদেশে। এরা সকলেই সমাজকল্যাণ দপ্তর পরিচালিত জলপাইগুড়ি শহরের রেসকোর্সপাড়ায অবস্থিত কোরক হোমের আবাসিক।

কোরক হোমের আবাসিকদের লেখা, গল্প, কবিতা, আঁকা ছবি দিয়ে এবারের চতুর্থ বর্ষ শারদীয়া সংখ্যা কোরক প্রকাশিত হবে মহালয়ার দিন। ছোটদের কলমেই উঠে এসেছে বড় বড় কথা। কীভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে বেড়া পার করতে গিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ধরা পড়েছে অনুপ্রবেশ আইনে, সেই অভিজ্ঞতাও লিখেছে কেউ। আবার কেউ তুলে ধরেছে উপার্জনের আশায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে নানা ঘাট ঘুরে এখন এসে ঠেকেছে কোরক হোমে।

কারও কারও কলমে উঠে এসেছে বাড়ির কথা। কোনও দুষ্কর্মে পাকেচক্রে জড়িয়ে পড়ে সাজা পেয়েছিল। কিছুদিন কাটাতে হয়েছে কোরক হোমে। তারপর সাজা শেষে বাড়ি ফিরে দেখেছে দুনিয়াটাই কেমন যেন বদলে গিয়েছে। যারা একসময় ভালোবাসত, তারা কেন জানি না এখন আর চিনতেই চাইছে না। ফের হোমেই ফিরে আসতে হয়েছে তাই বাধ্য হযে

শুধু কি লেখা? কলমের পাশাপাশি রং-তুলিতেও একেকজন বড়িয়া ওস্তাদ। ছবির মাধ্যমে বাড়ির কথা, নিজের গ্রাম, বাড়ির পাশের পুকুরটা ফুটিযে তুলেছে অনেকে। আবার বাস্তবে কোনওদিন না দেখলেও কল্পনার ডানা মেলে কেউ হয়তো এঁকেছে পাহাড়ের ছবি।

কেউ বাড়িছাড়া অবস্থায় রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই থাকত। কিন্তু উদ্ধার হওয়ার পর হোমে এসেছে। অনেকেই হোমে থেকে নিজের পড়াশোনা, স্কুলে যাওয়ার গল্প, হোমের লাইব্রেরিতে বই পড়া, হোমের মাঠে খেলাধুলো করার কথা নিজের নিজের মতো করে তুলে ধরেছে। সেসবই ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাবে মহালয়ার দিন।

কোরক হোমের সুপার ও পুজোবার্ষিকীর সম্পাদক দেবব্রত দেবনাথ বলেন, এই শিশু-কিশোর আবাসিকদের লেখা, আঁকা ছবি দিয়ে শারদীযা সংখ্যা প্রকাশিত হবে। ওদের মননে, চিন্তনেও যে সৃজনশীলতা রয়েছে, তা তাদের লেখা ও ছবিতে ফুটে উঠেছে।

নিজের লেখা বই হয়ে বের হবে, কেমন লাগছে? কোরকের আবাসিকরা জানিয়েচে, আমরা খুব খুশি। বাড়িতে থাকতে এইভাবে কখনও লিখিনি। স্কুলেও নিয়মিত যেতাম না। এখন হোমই আমাদের বাড়ি।