স্কুলছুটদের শিক্ষায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ ‘রাস্তার মাস্টারের’

273

রাজা বন্দোপাধ্যায়, আসানসোল: এবার আরও একটি অভিনব উদ্যোগ নিলেন ‘রাস্তার মাস্টার’ নামে পরিচিত আসানসোলের জামুড়িয়ার শিক্ষক দীপ নারায়ণ নায়ক। তিনি পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুড়িয়া (১) চক্রের অধীন তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এবার শুধুমাত্র স্কুলের পড়ুয়াই নয়, স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে শিক্ষার অধিকারকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য শুরু করলেন ‘চলো স্কুলে যাই’ প্রকল্পের। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে উপকৃত হবে রাস্তায় থাকা অনাথ, ভবঘুরে, শিশু শ্রমিকের কাজ দরিদ্র ও গরীব শিশুরা। তাদের জন্ম হয় এই রাস্তায়।

শৈশব থেকে জীবন ও জীবিকাও তাদের চলে এই রাস্তায়। তাদেরকে স্নেহ ও ভালোবাসা দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। অসহায়তা ও দারিদ্রতা তাদের নিত্যসঙ্গী। যে কারণে শৈশবে যাদের হাতে থাকার কথা বই, খাতা চক ও পেনসিল। কিন্তু তার বদলে তাদেরকে তুলে নিতে হয় থালা ও বাটি। অ-আ-ক-খ বলা তাদেরকে শুধু পেটের জ্বালায় অসহায়ভাবে বলতে হয় ‘বাবু এক টাকা দিন’। শিক্ষা তাদের কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বই, খাতা ও স্কুলব্যাগ যাদের কাছে স্বপ্ন। তাদের সেই স্বপ্নকে পূরণের জন্যই রাস্তার মাস্টারের এই অভিনব উদ্যোগ।

- Advertisement -

বড়দিন থেকে শুরু হওয়া ‘চলো স্কুলে যাই’ ৯ প্রকল্পটিকে দীপ নারায়নবাবু তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগের নাম দিয়েছেন ‘চলো প্লেট ছেড়ে স্লেট ধরি’। যেখানে পথশিশুদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার প্রতি অনুরাগী করা হবে, রাস্তার ফুটপাত করা পাঠশালায়। দ্বিতীয় ভাগে এইসব শিশুদের নাম সরকারি স্কুলে নথিভুক্ত করা হবে। যার ফলে প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত হবে। একবারে শেষ বা তৃতীয় ভাগে প্রতি শিশুকে নিয়মিতভাবে কাউন্সেলিং করা হবে। যাতে তাঁরা শিক্ষা থেকে কোনোভাবেই বিপথগামী না হয়। তাদেরকে সবরকমের গাইড ও পরামর্শ দেওয়া হবে যাতে তাদের মধ্যে থাক প্রতিভাকে সমাজের সামনে তাঁরা তুলে ধরতে পারে।

এদিনের অনুষ্ঠানে কেক কাটার মাধ্যমে নুর, বাল্মীকি, রাজু, মিনাক্ষি ও ঝিলিকের মতো পথ শিশুরা যীশুর জন্মদিনে নিজেদের জন্মটা পালন করে। দীপ নারায়ণবাবু বলেন, ‘এদিন পথশিশুরা কেক কাটার মাধ্যমে শুধু তাদের জন্মদিন নয়, নতুন জীবনের জন্মদিন পালন করল। এদিন থেকে তাঁরা পুরনো জীবনকে ভুলে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়ে নতুন জীবনে পা দিল।‘ তিনি আরও বলেন, এদিনের অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন প্রতিটি শিশু শিক্ষার অধিকার পেল। তেমন তাদের হাতে একটি করে স্কুলব্যাগ, বই, খাতা, স্লেট, পেনসিল সহ শিক্ষাসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। তেমনি অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাদের মুখে তুলে দেওয়া হয় পুষ্টিকর খাদ্য ও শীতের পোষাক।

এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা জেলা শিক্ষা দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষা বকুল মন্ডল বলেন, এদিনের অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করছি। একইসঙ্গে এই বিশেষ দিনে তিনি রাস্তার মাস্টারকে অনুপ্রাণিত করবার জন্য স্কুলব্যাগ তুলে দেন।

এছাড়াও ছিলেন জামুড়িয়া ও আসানসোল হিরাপুর চক্রের স্কুল পরিদর্শক অরিজিত মন্ডল। তিনি বলেন, ‘সরকার ঠিক যেটা চাইছে দীপ নারায়ণবাবু সেটি বাস্তবে করে দেখাচ্ছেন। আমি তাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে স্কুলছুট ও স্কুলর বাইরে থাকা শিশুদেরকে স্কুলমুখী করার, জন্য তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন তার সাফল্য কামনা করি। তার পাশে আছি।‘