চিন পিছু হটলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় সতর্ক ভারত

375

নয়াদিল্লি: ১৯৬২ সালের ১৫ জুলাই অর্থাৎ ঠিক ৫৮ বছর আগে সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম এতদিন পর ফের চিন্তায় ফেলেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে। ওই সংবাদটি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। যার শিরোনাম গালওয়ান পোস্ট থেকে চিনা বাহিনী সরে যাচ্ছে। সম্প্রতি পূর্ব লাদাখে শান্তি বজায় রাখতে ভারতের দাবি মেনে গালওয়ান থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে চিন। কিন্তু তাদের এই আপাত পিছু হটা বড় কোনও সংঘাতের প্রস্তুতি কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ভারতের।

১৯৬২-র যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই সতর্ক থাকতে হচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে। কারণ, সেবারও গ্রীষ্মকালের শুরুতে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল ভারত এবং চিন। তারপর পিছিয়ে গিয়েছিল লাল ফৌজ। সেটা ছিল ১৫ জুলাই, ১৯৬২। কিন্তু এর ঠিক ৯৬ দিন বাদে, ২০ অক্টোবর চিন আক্রমণ করেছিল ভারতকে। শুরু হয় ভারত-চিন যুদ্ধ। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস মনে রেখে সীমান্তে চোখ রয়েছে নয়াদিল্লির। তৈরি সেনাবাহিনীও।

- Advertisement -

ঠিক কী ঘটেছিল সেই সময়? গালওয়ান উপত্যকায় সে সময় পাহারায় ছিল গোর্খা রেজিমেন্ট। ৬ জুলাই চিনা বাহিনী গোর্খা বাহিনীকে দেখে আরও বড় বাহিনী নিয়ে সেখানে জড়ো হয়। দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। ১৯৬২-র ১৫ জুলাই, খবর প্রকাশিত হয়েছে, গালওয়ান পোস্ট থেকে ২০০ মিটার পিছু হটে গিয়েছে চিনা বাহিনী। পরের তিন মাস চিঠিচাপাটি চলে ভারত ও চিনের মধ্যে। নায়েক সুবেদার জং বাহাদুরের নেতৃত্বে ভারতীয় এলাকা আগলে বসে থাকে গোর্খা রেজিমেন্ট। গোর্খাদের বীরত্বেই চিনকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, এমন একটা খবর রূপকথা হয়ে য়ায়। ভারতের সামরিক ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন নায়েক সুবেদার জং বাহাদুর। এরপর শীত আসে। উপত্যকার তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের নীচে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গালওয়ান থেকে গোর্খা রেজিমেন্টকে সরিয়ে ৫ জাঠ আলফা কোম্পানিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। ওই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মেজর এসএস হাসাবনিস। ৪ অক্টোবর থেকে কপ্টারের মাধ্যমে ৫ জাঠ আলফা কোম্পানিকে গালওয়ানে নামানোর কাজ শুরু হয়। কয়েকদিনের মধ্যে সেই কাজ শেষও হয়ে যায়। এর কয়েকদিন পর ২০ অক্টোবর আচমকা হামলা চালায় লাল ফৌজ। নিহত হন ৩৬ জন ভারতীয় জওয়ান। শুরু হয়ে যায় ভারত-চিন যুদ্ধ। গালওয়ান ছাড়িয়ে ভারত-চিন সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধের আগুন। চিনা সৈন্যদের হাতে যুদ্ধবন্দি হন মেজর এসএস হাসাবনিস। ৭ মাস তিনি বন্দি শিবিরে কাটান। যুদ্ধ শেষ হলে মুক্তি পান তিনি।

প্রায় ৬ দশক পর এ বারও সংঘাতের কেন্দ্রে সেই গালওয়ান উপত্যকা। ঘটনাচক্রে মেজর এসএস হাসাবনিসের পুত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসাবনিস বর্তমানে ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ। ইতিহাসের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকেই সতর্ক চোখ রেখেছে দিল্লি ও ভারতীয় সেনা।

প্রাক্তন সেনাকর্তাদের অনুমান, সীমান্তে দুপা এগিয়ে এক পা পিছোনোর কৌশল নিয়েছে চিন। লালফৌজকে যাতে পুরোপুরি তাদের এলাকায় যেতে বাধ্য করা হয়, সেদিকেই দিল্লির জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তাঁরা। সেনা সূত্রের খবর, উত্তেজনা এড়াতে ভারতীয় এবং চিনা সেনার মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে। তাঁদের মতে, এগুলি ছোট পদক্ষেপ।

সূত্রের খবর, গালওয়ানের সেই সংঘাতের এলাকা বা টহলদারি পয়েন্ট ১৪ থেকে লালফৌজ পিছিয়ে যাওয়ার পর রবিবার রাতে সেই জায়গার দখল নিয়েছে ভারতীয় সেনা। খুব শীঘ্রই সেখানে ভারতীয় জওয়ানদের টহলদারিও শুরু হবে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি, গোগরা হট স্প্রিং ও প্যাংগং হ্রদের উত্তর দিকের অধিকৃত এলাকা থেকেও চিনা সাঁজোয়া গাড়িগুলি অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছে বলে সূত্রের খবর।

১৫ নম্বর প্যাট্রলিং পয়েন্ট থেকে বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মি। ফিঙ্গার পয়েন্ট ৫ থেকে ৮ এর মধ্যে সারি সারি কালো ত্রিপল ঢাকা চিনের সেনার ক্যাম্প লক্ষ্য করা গিয়েছে। সেখান থেকেও ছাউনি উধাও হয়েছে। মঙ্গলবারের মধ্যে সেনা সরানোর যাবতীয় কাজ শেষ করা হবে, এমনই কথা হয়েছে দুইপক্ষের।