সোনিয়ার মাস্টারস্ট্রোক, বাজি তবু মোদির হাতে

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত : লোহা গরম হ্যায়, মার দো হাতোড়া। শোলে-র সেই বিখ্যাত সংলাপ আমরা কেউই ভুলিনি। মনে হয় ভোলেননি সোনিয়াও। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি আদৌ শোলে দেখেছেন কি না জানা নেই (ঘনিষ্ঠ মহলের মতে অবশ্য তিনি হিন্দি সিনেমার বড় ভক্ত), তবে তাঁর কাজে সংলাপটির প্রতিফলন পড়েছে। তিনি শুধু লোহা গরম থাকতে হাতুড়ি চালাননি, ঠুকেঠুকে গরম লোহাটিকে আকার দেওয়ারও চেষ্টা করেছেন। কেন্দ্রীয় রাজনীতির মঞ্চে এই প্রাচীন প্রবাদ কতটা যুক্তিযুক্ত, সম্প্রতি লকডাউনের কালে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে ট্রেনের ভাড়া বিতর্কে তা ঠারেঠোরে বুঝিয়েছেন সোনিয়া। করোনা সংকটে বাড়ি ফিরতে হাজার হাজার হতদরিদ্র শ্রমিকদের ট্রেনের ভাড়া কংগ্রেসের তরফে বহন করার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। সরকারের যা করার কথা, সেই দায়িত্ব কংগ্রেসের নামে কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। বাকিটা সকলের জানা। ৪ মে থেকে শুরু হয়েছে লকডাউনের তৃতীয় অধ্যায়। এই সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্র অবশ্য স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়নি। ঘরে-বাইরে ব্যাপক চাপের ফলে শ্রমিকদের ফেরানোর সিদ্ধান্ত হয়। এতদিন কোনও হেলদোল দেখা যায়নি কেন্দ্রের, যখন জীবিকাহীন, অর্থহীন, খাদ্য ও সহায়সম্বলহীন মানুষ ঘরে ফেরার তাগিদে পথে নেমেছে। অভুক্ত অবস্থায় পাড়ি দিচ্ছে কয়েকশো কিলোমিটার, অবসন্ন দেহে ঢলে পড়েছে মৃত্যুমুখে।

রাষ্ট্র সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। বরং এগিয়ে দিয়েছে পুলিশের লাঠি। লকডাউনের মধ্যে একাধিকবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মানুষকে তালি, থালি বাজাতে বা আলো জ্বালাতে বলেন। একটিবারও পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করেননি। দুদফা লকডাউনের শেষে এখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে এই শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র। চালু হয়েছে নতুন ট্রেন শ্রমিক স্পেশাল। সেখানেই উঠে আসে কেন্দ্রের আরেক নির্মম রূপ। প্রথমে জানা গেল, শ্রমিকদের বিনাটিকিটে তাঁদের নিজের রাজ্যে ফেরাতে রাজি নয় রেলমন্ত্রক। করোনা মোকাবিলায় প্রায় ১৭১ কোটি টাকা পিএম কেয়ারে জমা পড়লেও গরিব শ্রমিকদের বিনাটিকিটে রাজ্যে ফেরানোর কোনও ঘোষণা ছিল না কেন্দ্রের পক্ষে। এমন অমানবিক, নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত হয়ে যায় দেশ। সরকার ঘনিষ্ঠ, দুর্নীতিগ্রস্ত শিল্পপতিদের লক্ষ লক্ষ টাকা ঋণ মাফ করলেও শ্রমিকদের জন্য এক টাকাও খরচা করতে চায়নি কেন্দ্র। ঠিক এই সময়টাকেই ক্রিজে নামার জন্য বেছে নেন কংগ্রেস সভানেত্রী এবং স্টেপ আউট করে কেন্দ্রের দেওয়া ফুলটসে ছক্কা হাঁকিয়ে দেন। ঘোষণা করেন, কেন্দ্র সরকারের যখন এতটাই দৈন্যদশা, তখন পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার টাকা জোগাবে কংগ্রেস। এই ঘোষণায় চমকে ওঠেন সবাই। নিঃসন্দেহে মাস্টারস্ট্রোক। ইতিপূর্বেও দেখা গিয়েছে, রাজনীতি ও কৌশলগত পন্থাকে কখনও আলাদা করে দেখেননি সোনিয়া।

- Advertisement -

পরিস্থিতি বুঝে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর অন্যতম গুণ। এক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। একসময় জল্পনা ছিল, নেত্রী হিসেবে সোনিয়ার যোগ্যতা কতটুকু? গান্ধি পরিবারের এক বিদেশি সদস্যা, যিনি হিন্দিও ভালো মতো বলতে পারেন না, যাঁর ঘনিষ্ঠ সহায়ক ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জনার্দন দ্বিবেদী তাঁর হিন্দি ভাষণ লিখে দেন, ইন্দিরা বা রাজীব গান্ধির পর কংগ্রেসকে কতটা জাতীয় রাজনীতির পরিসরে দিশা দেখাতে সক্ষম হবেন তিনি, তা নিয়ে এআইসিসির ঘরে-বাইরে অনেকে সন্দিহান ছিলেন। কংগ্রেসের এক পোড়খাওয়া নেতা অবশ্য বলে থাকেন, সোনিয়া চান লোকে বারবার তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুক। অত্যন্ত ক্ষুরধার তাঁর চিন্তাভাবনা। প্রিয়াঙ্কা কিয়দংশে তাঁর নাগাল পেলেও, নিজেকে বহু ভেঙেচুড়ে গড়ে নেওয়া রাহুল গান্ধিও তাঁর মমের সেই এক্সট্রা অর্ডিনারি ভিশন অ্যান্ড ইন্টেলেক্টের ছোঁয়া পাননি। সোনিয়ার ডিসিশন মেকিং ও টাইমিং বারবার তাঁকে গড়ে তুলেছে এক স্বতন্ত্র ও বিদগ্ধ রাজনীতিক হিসাবে। ঠিক সময়ে শ্রমিকদের ভাড়া মেটানোর সিদ্ধান্ত সেই রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে কংগ্রেসকে প্রধান বিরোধী শক্তি রূপে অনেকটাই অক্সিজেন দেবে। যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাজি এখনও মোদির হাতেই রয়েছে।

কংগ্রেসি দর্শন, বহুত্ববাদ থেকে শত যোজন দূরে অবস্থান মোদির। আরএসএসের শাখা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসতে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন। ২০১৪ সালে মোদির রাজ্যাভিষেক বুঝিয়ে দিয়েছিল, বংশবাদের বাইরে স্বতন্ত্র কিছু দেখতে আগ্রহী দেশ। তাই ভরসা মোদিই। তাঁর সেই ক্যারিশ্মার হাত ধরে দু-দুবার দিল্লির তখত দখল করেছে বিজেপি। মোদি পেয়েছেন অসামান্য জনপ্রিয়তা। তার কারণও রয়েছে। তিনি দক্ষ সংগঠক, সুবক্তা, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সর্বোপরি কল্পনালব্ধ তথাকথিত হিন্দু রাষ্ট্রের রূপকার। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠন তাঁর পৃষ্ঠপোষক। তাঁর এই শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল মোদি। তাই ঠিক হোক বা ভুল, প্রয়োজনে কড়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপ করতে পিছুপা হন না তিনি। নোটবাতিল বা জিএসটির মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তার প্রমাণ। রাজনৈতিক পরিসরে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে তার অপরিণত ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন আর নিজে হয়ে উঠেছেন দেশের মুখ। তিনি ভালো করে জানেন, এই একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তিগত দিগদর্শনে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। সোশ্যাল মিডিয়া জগতে তাঁর সক্রিয়তা, অভাবনীয় জনসংযোগ, রাজ্যে রাজ্যে দলীয় কর্মী, কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমন্বয়সাধন তাঁকে অন্য উচ্চতা দিয়েছে। হয়তো সেই জনপ্রিয়তাকে বাজি ধরে করোনার প্রাদুর্ভাবের সূচনার সময় গুজরাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তুমুল আদিখ্যেতা করতে পারেন।

ঠিক সেই সময় আবার সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুনে তোলপাড় হচ্ছিল উত্তর-পূর্ব দিল্লি। করোনার সতর্কবার্তা কিন্তু অনেক আগেই পেয়েছিল কেন্দ্র। জানুয়ারি ৩০ তারিখে দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত ধরা পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বিশ্বে করোনাকে মহামারি রূপে ঘোষণা করলেও সরকার ছিল নির্বিকার। চালু ছিল বাস, ট্রেন, আন্তঃরাজ্য ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা। ফলাফল পাওয়া গেল হাতেনাতে। দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু ছুঁতে চলেছে ২০০০-র ঘর। তার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে এই তর্জা চলছে। শ্রমিকদের ভাড়া দলের তরফে মেটানোর কথা বলে কেন্দ্রীয় সরকারকে অনেকটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পেরেছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি। তাঁর সিদ্ধান্ত বর্তমান রাজনৈতিক ডামাডোলে কংগ্রেসকে কিছুটা মজবুত স্থান গড়ে দিয়েছে। অনেকটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিজেপির ভাবমূর্তি। প্রশ্ন উঠেছে মোদির সর্বজনগ্রাহ্যতা নিয়েও। কংগ্রেসের রাজনৈতিক লাভ ও বিজেপির ক্ষতি নিয়ে জল্পনা শুরু হলেও, মোদির প্রভাব এত তাড়াতাড়ি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব। মোদির জনপ্রিয়তা এতটাই প্রবল যে, কংগ্রেসের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তও তাতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারবে না। সোনিয়া-মোদি নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণের ফলাফল এখন মিলবে না। মিলবে পরবর্তী নির্বাচনে। তখন আবারও মোদি ম্যাজিক উঠে এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ নরেন্দ্র মোদি জানেন, ভুল সিদ্ধান্তকে কীভাবে রাজনৈতিক কুশলতার চালে ঢেকে দেওয়া যায়।

তাই ট্রাম্প-বন্দনা হোক বা সংসদে তাঁর অনুপস্থিতি, শ্রমিকদের সমস্যা উপেক্ষা করা হোক বা ২১৭৩ দিনের শাসনকালে একবারও সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি না হওয়া, মোদি তাঁর তুরুপের তাস আসল সময়ে ঠিক চালবেন। শত দুঃখদুর্দশা ভুলে, কেন্দ্রীয় অবহেলা শিকেয় তুলে মানুষ আবার হয়তো তাঁর কথা শুনে তালি ও থালি বাজাবে। কংগ্রেসের সামান্য কিছু রাজনৈতিক মুনাফা হলেও এখনই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দূরবর্তী ইউটোপিয়া হিসেবেই সাব্যস্ত হবে। উপনিষদ বলে, জীব বা জড়, এই পৃথিবীতে যা কিছুর শুরু হয়, শেষও তার অবশ্যম্ভাবী। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে তাই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের গাফিলতির নিরিখে নরেন্দ্র মোদির মৌরসীপাট্টা শেষ হওয়ার এখনই কোনও সম্ভাবনা নেই। সোনিয়ার শ্রমিকদরদি ভূমিকাও সেই সম্ভাবনায় জল ঢালতে পারবে বলে মনে হয় না। তাই রাই ধৈর্যং রহো ধৈর্যং…।