দলীয় সমীক্ষার সঙ্গে অনেক অমিল উত্তরে, পিকের রিপোর্টে চিন্তায় নেত্রী

257

দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায়, কলকাতা : উত্তরবঙ্গ নিয়ে দলীয় সমীক্ষার সঙ্গে পিকের সমীক্ষার ফলাফল না মেলায় তৃণমূল নেত্রী চিন্তিত। দলের সমীক্ষায় আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলকে যত আসন দেওয়া হয়েছে, পিকের সমীক্ষা ততটা আশাপ্রদ নয়। এই পার্থক্যের সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে তৃণমূল নেতৃত্ব দলীয় বৈঠকে দুটি সমীক্ষা নিয়ে চুলচেরা বিচার করতে উদ্যোগী হয়েছেন। উত্তরবঙ্গ নিয়ে চিন্তিত তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিটি জেলার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে রিপোর্ট চেয়েছিলেন। তিনি পৃথকভাবে প্রশান্ত কিশোরের টিমের কাছ থেকেও উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে রিপোর্ট নিয়েছেন। কিন্তু দলীয় নেতত্বের পাঠানো রিপোর্টে খুব একটা সন্তুষ্ট নন মমতা। দলীয় সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গের ৫৪টি বিধানসভার মধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি আসন তৃণমূল পেতে পারে বলে জানিয়েছে দলীয় সমীক্ষা। কিন্তু এই রিপোর্টের সঙ্গে টিম পিকের রিপোর্টের অনেক ফারাক রয়েছে। পিকের টিম জানিয়ে দিয়েছে, উত্তরে খুব বেশি হলে ২৫টি আসন তৃণমূল পেতে পারে এবং তার মধ্যেও কিছু এক্স ফ্যাক্টর কাজ করবে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় বলেন, লোকসভা ভোটের সঙ্গে বিধানসভা ভোটের মিল নেই। গত ১০ বছরে বাংলার মানুষ তৃণমূল সরকারের কাছ থেকে যে পরিষেবা পেয়েছে তার ভিত্তিতেই ফের তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে। উত্তরবঙ্গেও আমাদের ভালো ফল হবে। তৃণমূল সূত্রে খবর, টিম পিকে এবং দলীয় নেতত্বের রিপোর্টের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে যেমন অমিল আছে তেমন কিছু জায়গায় দুটি সমীক্ষার রিপোর্ট মোটামুটি অভিন্ন। সমীক্ষা দুটিতে বলা হয়েছে, উত্তর দিনাজপুর জেলায় তৃণমূল সবচেয়ে ভালো ফল করবে। অন্যদিকে, মালদায় তৃণমূলের ফলাফল খারাপ হবে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে গত লোকসভার তুলনায় তৃণমূলের ফল ভালো হলেও গতবারের জেতা কয়েকটি আসন হাতছাড়া হতে পারে। টিম পিকে জানিয়েছে, আলিপুরদুয়ারে দলের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও এখনও সেখানে গতবারের জেতা সব আসন ধরে রাখার মতো পরিস্থিতিতে নেই তৃণমূল। বিমল গুরুং তৃণমূলকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করলেও কালচিনি বিধানসভায় কাকে প্রার্থী করা হবে তার ওপর জয়-পরাজয় নির্ভর করবে। মাদারিহাটে তৃণমূলের অবস্থা মোটেই ভলো নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। একইসঙ্গে নাগরাকাটায় বিমল গুরুং কিছুটা ফ্যাক্টর হলেও স্থানীয় বিধায়ক শুক্রা মুন্ডা দল ছাড়ার পর পরিস্থিতি কোনদিকে, তা এখনও তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে অস্পষ্ট। কোচবিহার নিয়ে পিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখানে চারটি আসন নিয়ে চিন্তা রয়েছে। এই চারটি আসনেই দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ফ্যাক্টর। তবে মিহির গোস্বামীর দলবদলে কোচবিহার দক্ষিণ আসনের বাইরে বিশেষ প্রভাব পড়বে না। তাছাড়া তুফানগঞ্জ, দিনহাটা ও মেখলিগঞ্জ আসন নিয়ে পিকে খুব একটা আশাবাদী নন। মালদায় গত লোকসভায় তৃণমূল দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও মিম এখানে প্রার্থী দিলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হতে পারে। সেক্ষেত্রে দলের মুসলিম ভোটব্যাংকে ধস নামতে পারে, যার ফায়দা পুরোপুরি বিজেপির দিকে যাবে। পিকের রিপোর্টে মালদায় দলের গোষ্ঠীকোন্দল নিয়ে আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
কিছুদিন আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গ ঘুরে এসেছেন। তিনি দলের নেতাদের কাছ থেকে রিপোর্ট চেয়েছিলেন। ওই রিপোর্ট সম্প্রতি দলনেত্রীর কাছে এসে পৌঁছেছে। তাতে উত্তরের নেতারা জানিয়েছেন, ৩০ থেকে ৩৫টি আসন দখল করার মতো অবস্থা রয়েছে দল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি জায়গায় ওই আসনগুলি দখল করা যে কার্যত অসম্ভব, তা অভিষেক উত্তরবঙ্গ ঘুরে এসেই বুঝেছেন। তাই উত্তরের নেতাদের ওই রিপোর্ট নিয়ে দলনেত্রী সন্তুষ্ট নন। তিনি দফায় দফায় টিম পিকের কাছে রিপোর্ট নিয়েছেন। তাতে দেখা গিয়েছে, দুয়ারে সরকার প্রকল্প কার্যকর হওয়ার পর আগের থেকে পরিস্থিতি অনেক ভালো হয়েছে। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসনের মধ্যে ৩৮টিতেই তৃণমূল পিছিয়ে ছিল। সেদিক থেকে বিচার করলে পিছিয়ে থাকা ৩৮টি আসনের মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ২০টিতে জয় সম্ভব হলেও বাকিগুলিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত বিজেপির প্রার্থীতালিকা ঘোষণা হওয়ার পর তাদের আদি ও নব্যের লড়াই কোন পর্যায়ে যায়, তার ওপরও ফলাফল অনেকখানি নির্ভর করবে বলে পিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
দার্জিলিং জেলায় ছয়টি আসনের মধ্যে পাহাড়ের তিনটি আসন বিমল গুরুংয়ের দখল করার সম্ভাবনা রয়েছে। গত লোকসভা ভোটে এই তিনটি আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন। তবে দার্জিলিং সমতলের তিনটি আসন দখল করা তৃণমূলের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন। জলপাইগুড়ি জেলাতেও কয়েকটি আসনে জোর লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেবের ডাবগ্রাম- ফুলবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে গত লোকসভায় তৃণমূল ৮৬ হাজার ভোটে পিছিয়ে থাকলেও এখন পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। এই কেন্দ্রে নমশূদ্র ও নেপালি ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে এই দুটি ভোটের জোরে এই আসনটি তৃণমূল পুনরুদ্ধার করতে পারবে বলে পিকের রিপোর্টে বলা হয়েছে। তবে কোচবিহার জেলায় দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বিধানসভা ভোটে কী প্রভাব ফেলে তার ওপর অন্তত ৩টি কেন্দ্রের ফলাফল নির্ভর করবে বলে জানাচ্ছে পিকের রিপোর্ট।