জ্যোতি সরকার  জলপাইগুড়ি : কোচবিহারের মহারাজার তৈরি করা কাছারি থেকে বর্তমানে সরকারি অফিস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে পরিচয়। পাশাপাশি বয়সের ভারে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে আয়রন হাউস। হেরিটেজ ঘোষণার জন্য সুপারিশ করা হলেও রাজ আমলের এই নিদর্শনের সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণে তেমন পদক্ষেপ করা হচ্ছে না। ফলে সময়ে সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার পথে এই ভবন। ১৮৭৬ সালে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ জলপাইগুড়ি থেকে কর আদায়ে সুবিধার্থে একটা কাছারি তৈরি করেন। সেই সময় জলপাইগুড়ির দেবীগঞ্জ থানা এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা কোচবিহারের মহারাজার অধীনে ছিল। সেই এলাকা থেকে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য এই ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। এই কাছারিতে থাকা লোহার সিন্দুকে করবাবদ আদায় হওয়া টাকা জমা থাকত। এই ভবনটি মূলত লোহার কাঠামোর উপর কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। লোহার কাঠামোর জন্য লোকমুখে ভবনটি আয়রন হাউস নামেও পরিচিত। আবার এলাকা পরিদর্শনে আসা মহারাজার মনোরঞ্জনের জন্য নাচ-গানের বন্দোবস্ত থাকায় নাচঘর নামেও পরিচিতি রয়েছে। ভবনের দেয়াল ও মেঝে কাঠের, উপরে টিনের চাল। প্রবেশপথে টিনের ছাউনি দেওয়া কাঠের সিঁড়ি রয়েছে।

বর্তমানে এই ভবনে জেলা শিক্ষা দপ্তরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের অফিস রয়েছে। এর মধ্যে একটি জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিস। সারাদিন বহু মানুষ এখানে নানা কাজে আসেন। সময়ে সঙ্গে সঙ্গে ভবনটি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ভবনের চাল থেকে জল পড়ে। বহু অংশে মেঝের পাটাতনের হালও ভালো নয়। রাজ্য হেরিটেজ কমিশন নিযুক্ত উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনস্থ হেরিটেজ কমিটি এই ভবনটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। কিন্তু এখনও বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আয়রন হাউসের বেহাল অংশগুলি সংস্কার করা যাচ্ছে না। তবে সময়ে সংস্কার না করা হলে হেরিটেজের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ভবনের কতটা বেঁচে থাকবে, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বিষয়টি নিয়ে জেলা শিক্ষা দপ্তরের তরফেও সরকারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, এই ভবনটি কোচবিহার মহারাজার কাছারি ভবন হিসাবে পরিচিত। কোচবিহারের মহারাজার জীবন ও কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কাজটা হেরিটেজ কমিশনকে করতে হবে। কিন্তু আয়রন হাউস আজও হেরিটেজ স্বীকৃতি পেল না। প্রাচীন এই ভবনের কাঠের পাটাতন দুর্বল হয়ে পড়ছে। টিনে জং ধরেছে। ভবনটি রক্ষা করতে রেস্টোরেশন ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শ নিতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য অমূল্য এই সম্পদকে যে কোনো মূল্যে সংরক্ষণ করতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নারায়ণ চক্রবর্তী, ছড়াকার পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়রা জানিয়েছেন, শতাব্দীপ্রচীন আয়রন হাউস জলপাইগুড়ির ঐতিহ্যের অংশ। এটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনিক কর্তাদের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।