শিলিগুড়ির র‌্যাশন ব্যবস্থা, চোরের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোক নেই

725

রণজিৎ ঘোষ : র‌্যাশন ব্যবস্থায় বহুদিন ধরেই দুর্নীতি চলছে শিলিগুড়িতে। শাসক, বিরোধী সবাই সবকিছু জানে। কিন্তু এই শহরে হুট কথাতেই মিছিল-মিটিং হয়, গরিব মানুষের জন্য সিপিএম, তৃণমূল বলুন বা কংগ্রেস, বিজেপি- সবার দরদ উথলে পড়ে, কিন্তু র‌্যাশনে যে সরকারি ভরতুকিতে গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ কয়েক কোটি টাকার খাদ্যসামগ্রী দিনের আলোয় চুরি হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করে না। নন ওয়ার্কার খাতে প্রতি মাসে কোটি টাকার র‌্যাশন সামগ্রী চুরির ঘটনা কারোরই অজানা নয়। কিন্তু অভিযুক্ত রাঘববোয়ালের বিরুদ্ধে কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? না হয়নি। বরং তাঁকে সুখে-শান্তিতে সরকারি ভরতুকির খাদ্যসামগ্রী খোলা বাজারে বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা মুনাফার সুয়োগ করে দেওয়া হচ্ছে। আর শুধু রাজ্যের বর্তমান শাসকদলকেই বা দোষ দিই কী করে। এই চোরের আমদানি তো করেছিল সিপিএম। সেই আমল থেকেই র‌্যাশনে চুরির সূত্রপাত। চোরকে গৃহস্থের ঘরে পাঠিয়ে চুরির মালের ভাগ নিয়েছে সিপিএম। পাছে কেঁচো খুঁজতে সাপ বেরিয়ে পড়ে, তাই হয়তো সিপিএম নেতারা র‌্যাশন চুরি নিয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। এখন সেই চোর তৃণমূল শিবিরে থেকে আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির সুয়োগে বিনা পুঁজিতেই ঘরে কয়েক কোটি টাকা আসছে।

বিষয়টা একটু খুলেই বলি তাহলে। র‌্যাশনে চুরি দীর্ঘদিন ধরে চললেও এর আগে মানুষকে যেমন কিছু টাকা দিয়ে র‌্যাশন সামগ্রী নিতে হত, তেমনই র‌্যাশন ডিস্ট্রিবিউটার, ডিলারকেও সেই পণ্যের দাম বাবদ অর্থ সরকারের ঘরে জমা করতে হত। কিন্তু এখন তো সমস্তটাই বিনামূল্যে। অর্থাৎ বিনা পয়সায় সরকারি গুদাম থেকে চাল, ডাল, গম, আটা এনে সেসব বিলি না করে চড়া দামে পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। র‌্যাশনে বিলি করা হবে কাদের মধ্যে? অধিকাংশই তো ভুয়ো র‌্যাশন কার্ড। সেই মানুষগুলোর অস্তিত্বই নেই। আমরা নই, সরকারি হিসেবই বলছে, শিলিগুড়ি মহকুমায় শুধুমাত্র নন ওয়ার্কার প্রায় ৮০ হাজার ভুয়ো র‌্যাশন কার্ড রয়েছে। এর বাইরেও বহু মানুষ র‌্যাশন নিতে যান না। ফলে সবমিলিয়ে প্রতি মাসে এখানে প্রায় এক লক্ষ মানুষের জন্য বরাদ্দ র‌্যাশন সামগ্রী চুরি হচ্ছে। একবার টাকার অঙ্কে চুরির পরিমাণটা ভেবে দেখুন!

- Advertisement -

প্রশ্ন ওঠা তো স্বাভাবিক, কেন এই চুরি বন্ধ করতে চোরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? আসলে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? যাঁদের এই দুর্নীতি বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তাঁরাই প্রথম থেকে হাত গুটিয়ে খাদ্যমন্ত্রীকে বহুবার এই দুর্নীতির খবর জানানো হয়েছে। বরাবরই তাঁর বক্তব্য, তদন্ত হচ্ছে, কমিশন বসছে। একবার শুনলাম তদন্ত কমিশন বসানো হয়েছে। কিন্তু কোথায় তদন্ত কমিশন, কোথায় তার রিপোর্ট, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেসব আপনি, আমি কেউই জানি না। ব্যবস্থা নেওয়া হলে নিশ্চয়ই আমরা জানতাম। এই তো মাস তিনেক আগে উত্তরকন্যায় বসে খাদ্যমন্ত্রী বলছিলেন, শিলিগুড়িতে র‌্যাশনের প্রচুর সামগ্রী চুরি হচ্ছে। নাম না করে এই চুরির ঘটনায় ওই রাঘববোয়ালের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন। উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থার আশ্বাসও দিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। কিন্তু বাস্তবে কিছু হয়েছে কি? এখানে কোনও তদন্ত হয়েছে বা হচ্ছে তেমনটা জেলা প্রশাসন, খাদ্য দপ্তর কেউই জানে না।

শুধু কি এই চুরি? পরিয়াযী শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার মাথাপিছু মাসে পাঁচ কেজি চাল এবং পরিবার পিছু এক কেজি ডাল বরাদ্দ করেছে। দুমাস এই বরাদ্দ দেওয়ার কথা। সরকারি নিয়মেই খাদ্য দপ্তর পরিযায়ীদের হাতে কুপন পৌঁছে দিয়েছে। শিলিগুড়িতেও এই বরাদ্দ এসেছে। সরকারি সূত্র বলছে, জেলায় পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা মেরেকেটে চার হাজার। কিন্তু খাদ্য দপ্তরের নথি বলছে, পরিয়াযী শ্রমিকদের জন্য ৯৮ হাজার কুপন বিলি করা হয়েছে। তাহলে বাকি কুপন পেল কে? কোথায় গেল সেই বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য? মানুষ এর জবাব চাইবেন না?