নেতাদের জার্সি বদলের খেলায় মুখ থুবড়ে ডালখোলার উন্নয়ন

131

অরুণ ঝা, ডালখোলা : জার্সি বদল ও কুর্সি দখলই যেন শেষ কথা। সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে নেতাদের মাথাব্যথা নেই। ডালখোলা পুর এলাকার সাধারণ মানুষ গত ১৭ বছরের পুরবোর্ডের বিরুদ্ধে এই ভাষাতেই তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। এমনকি সার্বিক উন্নয়নে ভৌগোলিক কারণেই যে খামতি রয়েছে তা খোদ পুরসভার প্রশাসক সুভাষ গোস্বামীও স্বীকার করে নিয়েছেন। প্রাক্তন পুরপ্রধান সিপিএম থেকে জার্সি বদলে বর্তমানে তৃণমূলে আসা হিমাদ্রী মুখোপাধ্যায় অবশ্য বিষয়টি মানতে নারাজ। অন্যদিকে তৃণমূলের ডালখোলা শহর সভাপতি তথা পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য তনয় দে উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার কথা স্পষ্টতই স্বীকার করে নিয়ে এলাকার বিধায়ক মনোদেব সিনহাকে একহাত নিয়েছেন। মনোদেববাবু পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীতেও ছিলেন। মনোদেববাবুকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ডালখোলা পুরসভা নিয়ে তৃণমূলের গোষ্ঠী কাজিয়ার  ফলে আসন্ন বিধানসভা ভোটে ডালখোলায় ভোটব্যাংক ধরে রাখাটা তৃণমূলের কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
ডালখোলা পুরসভা গঠনের ১৭ বছর পার হতে চলেছে। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত প্রায় দুই দশকে এলাকার নেতারা কুর্সি দখলের তাগিদে জার্সি বদলের রাজনীতিই করে গিয়েছেন। সেই তুলনায় উন্নয়ন এলাকায় নেই। নিকাশি ব্যবস্থার মাস্টারপ্ল্যান আজও হয়নি। পুর এলাকার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকায় পরিস্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ১৬টি ওয়ার্ডের বেহাল  রাস্তাঘাট নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। শহরের মাঝখান দিয়ে যাওয়া ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ও তার ফুটপাতে জবরদখল উচ্ছেদ করতে পুরবোর্ডের তৎপরতা দেখা যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের নরকযন্ত্রণা বছরের পর বছর ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে হাউজিং ফর অল প্রকল্পে মোটা টাকা কাটমানির অভিযোগ দলের ভিতর থেকেই পুরবোর্ডের বিরূদ্ধে তোলা হয়েছিল। ফলে কাটমানি ডালখোলা পুর এলাকার বড় ইস্যু। ১১ নম্বর ওয়ার্ড দিয়ে যাওয়া নিচিতপুরে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কে সংযোগকারী রাস্তার কঙ্কাল বেড়িয়ে পড়েছে। এলাকার বাসিন্দারাই বলছেন, গত চার বছর ধরে রাস্তাটি এই অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। পুরবোর্ড সব দেখেও নীরব হয়ে রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ডালখোলা পুরসভা ১৬০০ স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। যার মধ্যে প্রায় ১১০০ একর কৃষিজমি রয়েছে বলে পুরবোর্ড সূত্রেই জানা গিয়েছে। ফলে কৃষিজমির কারণে এলাকার উন্নয়ন মার খাচ্ছে বলে পুরবোর্ডের দাবি।
সিপিএমের একটি টার্ম শেষ হওয়ার পর কংগ্রেস ডালখোলা পুরসভার ক্ষমতা দখল করে। দীর্ঘদিন কংগ্রেস ডালখোলা পুরসভার ক্ষমতায় ছিল। তনয়বাবু থেকে সুভাষবাবু পুরসভার পুরপ্রধান থেকেছেন। যদিও সুভাষ গোস্বামীর পুরপ্রধান থাকার মেয়াদ সবচেয়ে বেশি। বছর কয়েক আগে কুর্সির দখল ধরে রাখতে জার্সি বদলে গোটা কংগ্রেসি পুরবোর্ড শাসকদল তৃণমূলে যোগ দেয়। কিন্তু তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর দলীয় কাউন্সিলারদের বড় অংশ সুভাষবাবুর বিরূদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আসে। যদিও দলের হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে সেই যাত্রায় বিক্ষুব্ধ কাউন্সিলাররা অনাস্থা প্রস্তাব থেকে পিছিয়ে আসেন। পুরবোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নির্বাচন হয়নি। ফলে গত তিন বছর থেকে পুরসভা প্রশাসক দিয়ে চলছে। এই প্রশাসকমণ্ডলী নিয়ে তৃণমূলের গোষ্ঠী কাজিয়া প্রকাশ্যে চলে এসেছে। নতুন প্রশাসকমণ্ডলীতে সংখ্যালঘু এবং হিন্দিভাষী মুখ রাখা হয়নি বলে প্রায় একমাস দলের সংখ্যালঘু সেল দলীয় কর্মসূচি বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এমনকি শহর তৃণমূল কংগ্রেস কমিটিও গোটা ঘটনায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পিকের টিম এলাকায় পৌঁছে দফায় দফায় বৈঠক করে। বিক্ষুব্ধদের দাবিপূরণ হওয়ায় বর্তমানে দলীয় কোন্দল ছাইচাপা রয়েছে।
হিমাদ্রীবাবু বলেন, উন্নয়ন একেবারে হয়নি তা ঠিক নয়। আগের তুলনায় ডালখোলা পুরসভার বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন হয়েছে। বাকি কাজও আগামীদিনে শেষ করা হবে। তনয়বাবু বলেন, সাধারণ মানুষের উন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভের কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যিনি বা যাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতা ভোগ করেছেন, উন্নয়নের কাজে তাঁদের আরও তত্পরতার প্রয়োজন ছিল। আমাদের বিধায়ক পুর এলাকার উন্নয়নে আগাগোড়াই উদাসীন। ডালখোলা পুর এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আমাদের ব্যর্থতা মেনে নিতেই হবে। পুরসভার প্রশাসক সুভাষ গোস্বামী বলেন, ডালখোলা এখনও পুরসভা হওয়ার যোগ্য নয়। কারণ, পুর এলাকায় ১১০০ একর কৃষিজমি। গ্রামাঞ্চলের ছোঁয়া আছেই। ফলে উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আমি উন্নয়ন নিয়ে কোনও রাজনীতি করি না। উন্নয়নের অনেক কাজই হয়েছে। সম্প্রতি পানীয় জল প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। এলাকায় বিরোধী থাকলেও তাঁদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্কই রয়েছে। দলের ভিতরে মতানৈক্য থাকতেই পারে। তাই বলে সাবোতাজ করার মানসিকতা কারো আছে বলে মনে করি না।