সিপিআই-ফব-আরএসপির এখন সাইনবোর্ডও খুঁজে পাওয়া কঠিন

157

দেবাশিস দাশগুপ্ত

প্রয়াত জ্যোতি বসু একটা কথা প্রায়ই বলতেন। বামফ্রন্টকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে। তারও অনেক আগে আরেক প্রয়াত সিপিএম নেতা প্রমোদ দাশগুপ্তও একই কথা বলে গিয়েছেন। বামফ্রন্টের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারাও সভাসমিতিতে ফ্রন্টকে রক্ষা করার কথা বলতেন। আজ সিপিএম এবং বামফ্রন্টের অন্য শরিক দলের বেশিরভাগ নেতাই আর নেই। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, ২০১১ সালের পর একের পর এক নির্বাচনে বামেদের বিপর্যয় তাঁদের দেখে যেতে হয়নি। ১৯৭৭ সালে জাতীয় এবং রাজ্য-রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে যে বাম নেতারা বামফ্রন্ট গড়ে তুলেছিলেন, আজ তাঁরা প্রায় সকলেই প্রয়াত।

- Advertisement -

 ২০০৯ সালের লোকসভা ভোট বা আরও স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে, ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে সেই যে বামেদের রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, আজ ১২ বছর পরেও তা বন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং রাজ্য-রাজনীতিতে বামেরা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। সংসদীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে বামেরা একেবারেই  প্রান্তিক এবং ক্ষয়িষ্ণু একটা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম তো বটেই, ফ্রন্টের মেজো, সেজো শরিকরাও একেবারে কোণঠাসা। কোথায় গেল সেই ১৯৭৭ সালের উজ্জীবিত বামফ্রন্ট?

আজ আলিমুদ্দিনে সিপিএম অফিস, লেনিন সরণির আরএসপি অফিস, এজেসি বোস রোডের সিপিআই অফিস বা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ফরওয়ার্ড ব্লক অফিসে প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।  জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, সরোজ মুখোপাধ্যায়, শৈলেন দাশগুপ্ত, আরএসপির ত্রিদিব চৌধুরী, মাখন পাল, ননী ভট্টাচার্য, ফরওয়ার্ড ব্লকের চিত্ত বসু, অশোক ঘোষ, সিপিআইয়ের ভূপেশ গুপ্ত, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, গীতা মুখোপাধ্যায়, নন্দগোপাল ভট্টাচার্যরা হয়তো ছবির ফ্রেম থেকে উত্তরসূরিদের ব্যঙ্গ করে বলেন, কী হে, এই যে এত কষ্ট করে আমরা বামফ্রন্ট তৈরি করলাম, তোমরা তো তাকে প্রায় উঠিয়ে ছাড়লে!

আজও যাঁরা বামফ্রন্টের কট্টর সমর্থক, যাঁরা গত শতাব্দীর সাতের দশকের ভয়াবহ দিনগুলি দেখেছেন, যাঁরা ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের ঐতিহাসিক জয় দেখেছেন, বেঁচে আছেন, তাঁরা কিন্তু এই দিনের কথা স্বপ্নেও ভাবেননি। যে মানুষ ৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্টকে সমর্থন করে এসেছেন, সেই মানুষ আজ কেন বিজেপি কিংবা তৃণমূলকে সমর্থন করছেন বা ভোট দিচ্ছেন, তার নিশ্চয়ই চুলচেরা বিশ্লেষণ বাম নেতারা একদিন করবেন। তবে একটা কথা ভাবতে খুব অবাক লাগে। সেই ২০০৮ সাল থেকে যে বিপর্যয় শুরু হয়েছে, আজ ১২-১৩ বছর পরেও কেন তা কাটিয়ে ওঠা গেল না, সেটা নিয়ে বাম দলগুলো এখনও কেন পর্যালোচনা করে উঠতে পারল না? ১৩ বছর কিন্তু খুব কম সময় নয়।

নয়ের দশকে মহাজাতি সদনে সিপিএমের এক সভায় জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, দলে এখন অনেক বেনোজল ঢুকে গিয়েছে। তাদের সরাতে হবে। তখন কিন্তু সিপিএমের নেতারা এই বেনোজল সরাতে মাস্টার প্ল্যান করেননি। দলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রবল হয়েছে, প্রোমোটারিকে মদত দেওয়া হয়েছে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, উপদলীয় কোন্দলকে বাড়তে দেওয়া হয়েছে, মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে নেতারা ঢুকে পড়েছেন। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বসে নেতারা সেসব নীরবে দেখে গিয়েছেন। তার থেকেও বড় কথা, বামপন্থীরা মানুষের কাছ থেকে ক্রমশই দূরে সরে গিয়েছেন। জ্যোতিবাবু সবসময় বলতেন, আমাদের বারবার মানুষের কাছে যেতে হবে, কারণ মানুষই শেষকথা বলে।

এবার দেখা যাক, এই চরম বিপর্যয়ে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলোর কী অবস্থা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুমকি দিয়েছিলেন, সিপিএম, কংগ্রেসকে সাইনবোর্ড করে ছাড়ব। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সেই কথা তৃণমূল নেত্রী রেখেছেন। সিপিএম এবং কংগ্রেসের সাইনবোর্ডটাই শুধু আছে। সিপিএমের তো তবু সাইনবোর্ডটা আছে। ফ্রন্টের অন্য শরিক দলগুলোর তো সাইনবোর্ডও খুঁজে পাওয়া ভার। অনেকদিন হয়ে গেল, এইসব শরিক দলের রাজ্য দপ্তরে যাওয়া হয় না। গেলে হয়তো দেখা যাবে, অফিসগুলো খাঁখাঁ করছে, হয়তো বাতি দেওয়ারও লোক নেই। ভাবতেও খারাপ লাগে। যখন ক্ষমতায় ছিল, পার্টি অফিসগুলো গমগম করত। কী সব দিন ছিল তখন? আমরা সাংবাদিকরা দলবেঁধে এই অফিস থেকে ওই অফিসে ঘুরে বেড়াতাম। নেতাদের সঙ্গে নানা ধরনের গল্প, আলোচনা হত। মনে পড়ছে, প্রবীণ  ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা প্রয়াত অশোক ঘোষের কথা। মাঝে মাঝেই ফোনে ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, সময় করে একটু এসো, কথা আছে কিংবা আরএসপির দেবব্রত ব্যানার্জি বা ক্ষিতি গোস্বামীর কথাও খুব মনে পড়ে। মাঝে মাঝেই যেতাম লেনিন সরণিতে আরএসপি অফিসে।

ভাবি, বামফ্রন্টের এই মাঝারি শরিক দলগুলোর কী হবে। সব দলেরই আলাদা আলাদা নীতি আছে, বিশ্বাস আছে। কেউ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, কেউ জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, কেউ বা আবার জাতীয় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা বলে। কিন্তু দলগুলোর অস্তিত্বই যদি না থাকে, তাহলে আর কীসের স্বপ্ন দেখা? সিপিএম তবু একটা রেজিমেন্টেড পার্টি। তাদের একটা সাংগঠনিক বাঁধন আছে। কিন্তু এই মাঝারি বাম দলগুলোর কী হবে? বরাবর দেখে এসেছি, সিপিএমের ঘাড়ে চেপে শরিক দলগুলো ভোটে জিতত। একেবারে শুরুর দিকে কিছু কিছু জেলায় কোনও কোনও শরিকের সংগঠন শক্তিশালী ছিল। যেমন উত্তরবঙ্গে আরএসপি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের একটা সময় খুব প্রভাব ছিল। মুর্শিদাবাদে আরএসপির ভালো সংগঠন ছিল। দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও তাদের মজবুত সংগঠন ছিল। বড় শরিক সিপিএম ছোট শরিকদের সেইসব পকেটে থাবা বসাতে শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে জেলায় জেলায় শরিকি সংঘর্ষ হয়েছে। মনকষাকষি হয়েছে। তবে বামফ্রন্ট কখনও ভেঙে যায়নি। বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খেতে চায়, তেমনি ফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম ছোট শরিকদের গিলে খেতে চেয়েছে। এখন যেমন জেলায় জেলায় তৃণমূলের মধ্যে গোষ্ঠী সংঘর্ষ হয়, তেমনই অতীতে হত শরিকি সংঘর্ষ।

ক্ষমতায় থাকলে একরকম আর ক্ষমতায় না থাকলে অন্যরকম। কলকাতায় বামফ্রন্টের ছোট শরিক দলগুলোর রাজ্য অফিস এখন কার্যত মাছি তাড়ায়। জানি না, জেলাগুলোতে এসবের হাল কেমন। গতবছর মুর্শিদাবাদে আরএসপির জেলা পার্টি অফিসে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। অত বড় পার্টি অফিস। জেলা সম্পাদক জনাতিনেক লোক নিয়ে বসে আছেন, দেখেছিলাম। অথচ আরএসপির এই জেলা অফিসেই পঁচিশ বছর আগে গিয়ে দেখেছি, কী জমজমাট চেহারা। এমনিতেই ২০১১ সালে পালাবদলের পর জেলায় জেলায় সিপিএম এবং ফ্রন্টের অন্য শরিকের বহু পার্টি অফিস তৃণমূল দখল করে নিয়েছে। এখন হয়তো কিছু অফিস তারা ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ফিরিয়ে দিলে কী হবে? অফিসে বসার লোক কোথায় এখন?

বড় শরিক হয়ে সিপিএমই যখন সাংগঠনিক বিপর্যয় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে, তখন ছোট শরিকদের অবস্থা যে আরও করুণ হবে, সেটা তো বলাই বাহুল্য। তারাও এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। এই সংকট কি আদৌ কাটবে, প্রশ্ন সেটাই।

(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক)