দৌড়ে বাংলা জয়ের টার্গেট ইটাহারের জিয়াসমিনের

224

রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার :  ক্লাস এইট থেকে দৌড়াচ্ছে মেয়েটা। এখনও ফিনিশিং পয়েন্টে পৌঁছাতে পারেনি। তবে গত দুই বছরে শুধু দৌড়েই নিজের ঝুলিতে ভরেছে ৩৮টি সার্টিফিকেট, ৩৬ টি মেডেল আর খান বিশেক ট্রফি। ব্লক, মহকুমা ও জেলাস্তরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আপাতত ইটাহারের মেয়ে জিয়াসমিন সুলতানার টার্গেট বাংলা জয়।

এবছর মাধ্যমিক দিয়েছে জিয়াসমিন। দৌড় কিন্তু থামেনি। দৌড়াচ্ছে… হাঁফাচ্ছে। আবার দৌড়াচ্ছে। যেতে হবে বহুদূর। স্বপ্নটা য়ে অনেক বড়। অলিম্পিক। হ্যাঁ, পেটে পুষ্টির খাবার না থাক। তবু স্বপ্ন দেখছে জিয়াসমিন। প্রাণপণে দৌড়ে তাকে পৌঁছাতেই হবে। ছুঁতে হবে অলিম্পিকের মাঠ। কিন্তু লক্ষ্যভেদের আগে হাজারো হার্ডল আর পিছুটান যেন তার গতি রোধ করে দিতে চাইছে। তবু সে নাছোড়। তার মনে আছে বিশ্বাস, স্বপ্নপূরণ করবেই একদিন।

- Advertisement -

জিয়াসমিন ইটাহার গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রী। বাড়ি ইটাহারের উত্তরপাড়ায়। বাবা সুলতান মহম্মদ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ির কাজ করেন। থাকেন কেরলে। বাড়িতে মা, দাদা ও দিদির সঙ্গে থাকে জিয়াসমিন। পড়াশোনায় তেমন মন নেই। আসলে তার ধ্যানজ্ঞান বলতে মাঠ আর দৌড়ের ট্র‌্যাক। জিয়াসমিন যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী, তখন থেকেই খেলাধুলোয় বিশেষ করে দৌড়ে তার ঝোঁক তৈরি হয়। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে সেবারই সাব জুনিয়ার গ্রুপে প্রথম স্থান। এরপর নিজের স্কুল থেকে শুরু করে আন্তঃবিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সবকটিতেই পারদর্শিতা দেখিয়েছে লিকলিকে চেহারার জিয়াসমিন। স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডিএসএ সহ বিভিন্ন ক্লাব ও সংস্থা আয়োজিত দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে সাফল্য অর্জন করে সবার নজর কেড়েছে জিয়াসমিন।

গত একবছর ধরে সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে রায়গঞ্জের সজলকুমার দাসের কাছে। সজলবাবু তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে জেলার ক্রীড়াবিদ ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন বহুদিন ধরে। তাঁর কথায়, ‘জিয়াসমিন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি মেয়ে আমিও ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। ওর পারদর্শিতা এবং জেদ দেখে আমি অবাক হয়েছি। সে পারবে, অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারবে। স্কুল মিটের পাশাপাশি ওপেন মিটেও সে নিজের পারদর্শিতা দেখিয়েছে।’ সজলবাবু বলেন, ‘ওর এই পরিশ্রমের জন্য শরীরে যে পুষ্টির দরকার, সেটা সে পায় না। খুব কষ্ট হয় আমার। যদি সরকারিভাবে একটু আর্থিক সাহায্য বা প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করে ওকে একটু সাহায্য করা হত, তাহলে জিয়াসমিন ওর নিজের গতিতেই এগিয়ে যেতে পারত।’

বাড়িতে রোজ ডালভাত খেয়ে শরীরে পুষ্টি জোগায় জিয়াসমিন। তবু কোনও প্রতিবাদ নেই। বরং হাসিমুখেই ছুটে যায় মাঠে। রোজ প্র‌্যাকটিসের জন্য ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দৌড়ায় সে। জিয়াসমিন বলে, ‘সামনেই স্টেট মিট আছে। কিছু একটা করতেই হবে। তা না হলে ন্যাশনাল মিটে যেতে পারব না। কোনওদিন পূরণ হবে কিনা জানি না। কিন্তু আমি অলিম্পিকের মাঠে দৌড়ানোর স্বপ্ন দেখি।’ জিয়াসমিনের মা পিঙ্কি বিবি বলেন, ‘মেয়ে দৌড় ছাড়া কিছু বোঝে না। ওর বাবা কেরলে শ্রমিকের কাজ করে। ওই একজনের রোজগারেই গোটা সংসারটা টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। রোজ পেটভরে ডালভাতটা জোগাড় করতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে। আজকে শুধু বাঁধাকপি ভাজা আর ভাত খেয়ে পেট ভরালাম মা, মেয়ে ও ছেলে মিলে। কী করব ! জানি না মেয়েটার ইচ্ছা শেষ পর‌্যন্ত পূরণ হবে কিনা!’

শুধু নিজের জেদে জিয়াসমিন দৌড়ে চলে। মাঠে দাঁড়িয়ে উৎসাহ জোগান সজলবাবু, ‘রান, জিয়া… রান।’