সার্কিট বেঞ্চ ফাঁকা, যাত্রী নেই সুনীলের টোটোয়

142

বহু লড়াই করে জলপাইগুড়ি পেয়েছিল হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ। কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল স্থানীয় মানুষের? উত্তরবঙ্গ সংবাদের তদন্ত।   আজ প্রথম কিস্তি

জলপাইগুড়ি : সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে স্টেশন রোড গমগম করবে। দুপুর গড়াতেই ভিড় উপচে পড়বে খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁগুলিতে। বাইরে থেকে আসা উকিলবাবু আর মক্কেলদের ভিড় হোটেলের ঘরগুলি সামাল দিতেই পারবে না। কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চকে ঘিরে জলপাইগুড়ি এই স্বপ্নই দেখেছিল। দীর্ঘ অপেক্ষা, আন্দোলনের পর একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে ২০১৯ সালের ৯ মার্চ জলপাইগুড়ি এক নতুন সূর্যোদয় দেখে। অস্থায়ী পরিকাঠামোয় সেদিন সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের নিরাপত্তার কারণে সেদিন স্টেশনবাজার এলাকায় বহু দোকান খুলতেই দেওয়া হয়নি। রবীন ঘোষের মিষ্টির দোকানের দেওয়াল ঘেঁষে সার্কিট বেঞ্চ ভালোভাবে চলছে, মানুষ বিচারও পাচ্ছে। কিন্তু রবীনবাবুর দোকান কলেবরে সেই একই রয়ে গিয়েছে। রবীনবাবুর পাশাপাশি সার্কিট বেঞ্চকে নিয়ে  যে হোটেল ব্যবসায়ী, টোটোচালক, নিদেনপক্ষে  যে ফুটপাথ ব্যবসায়ী জীবনবদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সবাই হতাশ।

- Advertisement -

পাশপাশি দুই শহর জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি। দুই শহরে বাসিন্দাদের একে অপরের প্রতি আন্তরিকতা থাকলেও  এলাকার উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে কেউ কাউকে জমি ছাড়তে রাজি নয়। সার্কিট বেঞ্চ নিয়ে একটা সময়ে এমনই প্রতিযোগিতা ছিল। প্রবীণদের কথায়, ১৯৬৮ সালের বন্যার পর জলপাইগুড়ি অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। পরে নেপাল, সিকিম, ভুটান ও বিহারের গেটওয়ে হওয়ায় শিলিগুড়ি অনেকটা এগোলেও জলপাইগুড়ির সেই সৌভাগ্য হয়নি। শহর তথা জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জলপাইগুড়ির মাটিতেই সার্কিট বেঞ্চের জন্য আন্দোলন শুরু হয়। একটা সময় জলপাইগুড়ির দাবিপূরণ। অস্থায়ী পরিকাঠামোতে সার্কিট বেঞ্চের কাজকর্ম শুরু হয়। স্থাযী পরিকাঠামোর জন্য সম্প্রতি অর্থও বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

কিন্তু কেন? সূত্রের খবর, এই সার্কিট বেঞ্চের অধীনে জলপাইগুড়ির পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার ও দার্জিলিং জেলা রয়েছে। এই জেলাগুলি থেকে যাঁরা স্টেশন রোডের সার্কিট বেঞ্চে কাজে আসেন, কাজ শেষে তাঁরা সাধারণত সেদিনই বাড়ি ফিরে যান। আর এই সূত্রেই এখানকার ব্যবসা জমার স্বপ্নে আপাতত ইতি।

মিষ্টি ব্যবসায়ী রবীন ঘোষের কথায়, দোকানের পাশে সার্কিট বেঞ্চ হলেও প্রত্যাশার এক শতাংশও পূরণ হয়নি। শুনেছিলাম, সার্কিট বেঞ্চ হলে বাইরে থেকে এখানে প্রচুর লোক আসবে। রোড স্টেশনে বিভিন্ন ট্রেনের স্টপেজ হবে। টাউন স্টেশন থেকে কলকাতাগামী নতুন ট্রেন চালু হবে। কিন্তু কোথায়? নতুন ট্রেন তো দূরের কথা, দার্জিলিং মেল ও তিস্তা-তোর্ষাকেও তো জলপাইগুড়ি টাউন স্টেশন থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এতে কি আর আর্থসামাজিক ছবিটা বদলাবে?

দুবছরে শহরের হোটেলগুলির ব্যবসা সেভাবে বাড়েনি। হোটেল ব্যবসায়ী সুশোভন সরকারের কথায়, দুবছর হল সার্কিট বেঞ্চ চালু হয়েছে। কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষই সার্কিট বেঞ্চের কাজে জলপাইগুড়িতে এসে এখানকার হোটেলে উঠেছে। মাঝেমধ্যে কিছু আইনজীবী কলকাতা থেকে এখানে আসেন বটে। কিন্তু আশপাশের জেলা থেকে এখানে যাঁরা আসেন তাঁরা কেউই এখানকার হোটেলে ওঠেন না। দুই দিনাজপুর ও মালদাকে  যদি এই সার্কিট বেঞ্চের অধীনে আনা  যায় তবে হয়তো আমাদের হোটেল সংক্রান্ত এই ছবিটা বদলাতে পারে। সার্কিট বেঞ্চকে কেন্দ্র করে ভিড় হবে ধরে নিয়ে যানচালকরাও স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন এখনও অধরা। টোটোচালক সুনীল মণ্ডলের কথায়, বিএ পাশ করেও সরকারি চাকরি পাইনি। সংসারের হাল ধরতে টোটো চালানো শুরু করি। ভেবেছিলাম সার্কিট বেঞ্চ চালু হওয়ার পর টোটো বিক্রি করে একটা গাড়ি কিনব। কারণ তখন তো অনেকে বাইরে থেকে এখানে আসবেন। তাঁদের অনেকেই এয়ারপোর্ট যাবেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ভালো হবে। কিন্তু কোথায়? শহরে তো বাইরের লোক বলতে জেলা আদালত আর হাসপাতালে যাঁরা আসেন, কেবলমাত্র তাঁরাই। সার্কিট বেঞ্চে যাবেন বলে কেউ আজ পর্যন্ত আমার টোটোয় উঠেছেন বলে মনে পড়ে না।