জলপাইগুড়িতে ভাগ্য নির্ধারণ হবে চা বলয়ের ভোটে

491

জলপাইগুড়ি ব্যুরো : মাসদুয়েক আগেকার কথা। ব্লক কনভেনার মনোনয়নের পর জলপাইগুড়ি পার্টি অফিসে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আর জেলা সভাপতি কৃষ্ণকুমার কল্যাণীকে আটকে রেখে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন দলেরই কিছু নেতা-কর্মী। নিন্দুকরা বলেন, জেলা সভাপতির অনুগতরাই সেদিন বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন মন্ত্রীকে হেনস্তা করার জন্য। গত লোকসভা ভোটে বিজেপির কাছে জলপাইগুড়ি লোকসভা আসন হারানোর পর জলপাইগুড়ি জেলার দায়িত্ব কৃষ্ণকুমার কল্যাণীর হাতে তুলে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, এককথায় তাঁকে অনেকটাই ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছেন জেলায় সংগঠন গুছিয়ে তোলার জন্য। কিন্তু চা শিল্পপতি কৃষ্ণবাবু জেলায় সংগঠন কিছুটা সাজাতে গিয়ে দলের গোষ্ঠীবিরোধকে এতটাই চাগিয়ে দিয়েছেন যে সেটাই এখন দিদির সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। গৌতম দেব, অরূপ বিশ্বাসের মতো পোড়খাওয়া নেতাদের বারবার পাঠিয়ে জলপাইগুড়ির এই কোন্দল তৃণমূল নেত্রী সামাল দিতে পারছেন না। জলপাইগুড়ি চা বলয়ের তৃণমূলের নেতা অমরনাথ ঝা বা রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায় তো একাধিকবার জেলা সভাপতির নামে বিবৃতি দিয়েছেন। আর মোহন বসুর মতো প্রবীণ নেতাকে তো কৃষ্ণবাবু কার্যত শত্রু বানিয়ে ফেলেছেন।

জলপাইগুড়িতে তৃণমূলের পরিস্থিতি কেমন তার একটা ছবি দেখানো যাক। কৃষ্ণবাবু জেলা সভাপতি হওয়ার পর লোকসভা ভোটে দলের বিপর্যয়ের দায় পুরোপুরি ব্লক নেতাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাঁদের পদ থেকে ছেঁটে ফেলেন। পরিবর্তে ব্লক কনভেনার করে নিজের অনুগতদের ব্লকের দায়িত্বে আনেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি ১৫ জন ব্লক সভাপতির মধ্যে ১৪ জনকেই বিক্ষুব্ধ করে দেন। তাঁদের মধ্যে অমরনাথ ঝা, স্বপন সাহার মতো নেতারাও ছিলেন। জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে এই নেতারা আলাদা বৈঠক করে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে তাঁদের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। রাজ্য নেতৃত্বের সামনে দাঁড়িয়ে জেলা সভাপতির নামে সরাসরি দলের বিধায়করা, প্রবীণ নেতারা নালিশ করছেন, এমন ঘটনা জলপাইগুড়ি ছাড়া আর কোনও জেলায় খুব একটা ঘটেনি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে কৃষ্ণবাবুর বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ যে তৃণমূলের ঘর পোড়াবে সেই ভবিষ্যদ্বাণী অনেকেই করছেন। সত্যি বলতে, এই জেলায় জাতিগত ভোটের অঙ্কে তৃণমূল শুধু লড়াই করা নয়, অনেক বিধানসভা আসনে এগিয়ে ছিল। গত লোকসভা ভোটে বিজেপি জেলার সাতটি বিধানসভা আসনের মধ্যে ছয়টিতেই এগিয়ে গেলেও তার অনেকটাই ছিল মোদি হাওয়ায় ভেসে। তা বলে তৃণমূলের সংগঠনে ধস নেমেছিল, এমন কথা বিজেপির কট্টর সমর্থকরাও বলেন না। অথচ কৃষ্ণবাবু ঘর সাজানোর নামে নিজেদের ঘরেই আগুন ধরিয়েছেন। বিধানসভা ভোটের আগে সেই আগুন নেভানোটাই তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

- Advertisement -

আমাদের সমীক্ষার ফল বলছে, পরিস্থিতি এমনই যে এখন ভোট হলে ধূপগুড়ি, মাল, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়িতে বিজেপি এগিয়ে থাকবে। জলপাইগুড়ি শহর বরাবরের মতোই বাম-কংগ্রেসে ঝুঁকে। রাজগঞ্জে সাংগঠনিক কারণেই এগিয়ে তৃণমূল। ময়নাগুড়িতে অনন্তদেব অধিকারী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে দলকে জিতিয়ে আনতে পারেন। জেলার নাগরাকাটা বিধানসভা আসন অবশ্য আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসনের মধ্যে পড়ে। আলিপুরদুয়ারের বিজেপি সাংসদ জন বারলার খাসতালুক হওয়ায় নাগরাকাটা অনেকটাই বিজেপির দিকে ঝুঁকে। তার অবশ্য অন্য একটা বড় কারণ এখানকার চা বাগানের অহিন্দু আদিবাসী এবং অবাঙালি সম্প্রদায়ের ভোট।

এই জাতি-সম্প্রদায়ের অঙ্কটা কিন্তু জলপাইগুড়ি জেলাজুড়েই বেশ জটিল। চা বলয়জুড়ে আদিবাসী, অহিন্দু আদিবাসী, রাজবংশী-কামতাপুরিদের বাস। তাঁদের জাতিসত্তা, চাওয়া-পাওয়া, মান-অভিমানের অঙ্ক জড়িয়ে থাকে এখানকার ভোটে। জেলায় রাজবংশী-কামতাপুরি মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ। এঁদের মধ্যে একাধিক অরাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব মঞ্চের বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত সক্রিয় এবং তাঁরা মতামত তৈরির ক্ষমতা রাখেন। এঁদের সক্রিয় ভূমিকার কথা মাথায় রেখেই আরএসএস এঁদের ওপর কিছুটা প্রভাব বাড়াতে চাইছে। মঙ্গলবার উত্তরকন্যায় আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ির প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীও ইঙ্গিত দিয়েছেন কামতাপুরি ও রাজবংশীদের মধ্যে যে বিভেদ রয়েছে সে ব্যাপারে প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে তিনি ঢুকতে চান না। বাস্তবে, আলাদা উন্নয়ন বোর্ড, আকাদেমি করে কামতাপুরি ও রাজবংশী দুটো ভোটব্যাংকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে তিনি চেষ্টা করছেন। কখনও অতুল রায়, কখনও বংশীবদন বর্মনের সঙ্গে সমঝোতায় আসছেন। কিন্তু তারপরও এই বিশাল ভোটব্যাংক যে তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে এসেছে তা বলা যাবে না।

জলপাইগুড়ি জেলায় ভোটার হিসাবে ১২ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলমান, ৫ শতাংশ খ্রিস্টান ও ১ শতাংশের মতো বৌদ্ধ। এই মুসলিম ভোটব্যাংকের ৭৫ শতাংশই তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে। বাকি ২৫ শতাংশ বাম-কংগ্রেসে সহানুভূতিশীল। এই ভোটব্যাংকে তৃণমূল থাবা বসাতে পারলে তাদেরই লাভ। জন বারলার কারণেই খ্রিস্টান ভোটব্যাংক বিজেপির দিকে ঝুঁকে। মুসলিম ভোট ব্যাংক যাতে পুরোপুরি তৃণমূলের কবজায় না যায় সেজন্য বিজেপিও কলকাঠি নাড়ছে। জলপাইগুড়ি জেলার সাতটি বিধানসভা আসনের মধ্যে চারটিতেই নির্ণায়ক শক্তি হয় চা বাগানের ভোট। ফলে এই বিশাল ভোটব্যাংক তৃণমূল-বিজেপি দুপক্ষেরই টার্গেট। এই ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখেই এবারও উত্তরকন্যার বৈঠকে চা সুন্দরী প্রকল্পে এত জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। চা বলয়ে মিড-ডে মিলের পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়াদের সবুজ সাথীর সাইকেল, ইউনিফর্ম, জুতো সহ অনেক কিছু দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গত বিধানসভা ভোটেও তার সুফল পেয়েছিল তৃণমূল। রাজ্য সরকারি প্রকল্পগুলি নিয়ে তৃণমূল নেতারা ঠিকমতো প্রচার করলে এবারও তার সুফল তৃণমূল পেতে পারে। তবে চা বলয়ে তৃণমূলকে সবচেয়ে বিব্রত করছে চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি। ধরি মাছ না ছুঁই পানি- এমন মনোভাব নিয়ে চলা আখেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে ক্ষতিই করেছে। প্রত্যাশিতভাবেই ন্যূনতম মজুরি চুক্তিকে বিধানসভা ভোটে ইস্যু করবে বিজেপি।

জলপাইগুড়ি জেলায় উন্নয়নের কাজ অবশ্য তৃণমূল কম করেনি। প্রচুর ঝাঁ চকচকে রাস্তা, কৃষক মান্ডি, মেডিকেল কলেজের শিলান্যাস, সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, সার্কিট বেঞ্চ- তৃণমূলের বলার মতো ইস্যু কম নেই। কন্যাশ্রী, সবুজশ্রী, ঐক্যশ্রীর মতো প্রকল্পগুলির পাশাপাশি এই কাজগুলি অবশ্যই তৃণমূল নেত্রীর প্লাস পয়েন্ট। তাহলে সমস্যা কোথায়? রাস্তা তৈরি হলেও কাটমানি দিতে দিতে নাজেহাল ঠিকাদাররা নিম্নমানের কাজ করেছেন। ফলে তৈরি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা ভেঙেছে। আবার কৃষকবন্ধু, আবাস যোজনার মতো প্রকল্পের উপভোক্তারা কাটমানি দেওয়ার ক্ষোভ পুষে রেখেছেন। এমনকি ১০০ দিনের কাজের টাকা পাওয়া নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন এসএসসির মতো সরকারি চাকরির দরজা বন্ধ থাকা, জেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসক না থাকার মতো বিষয়গুলি রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। জেলার শিক্ষিত মানুষজনের বড় অংশ এজন্য রাজ্যের শাসকদলের ওপর বীতশ্রদ্ধ।

তৃণমূলের এই নেগেটিভ পয়েন্টগুলিই বিজেপির হাতিয়ার। গতবার মোদি হাওয়া এবার তেমন কাজ না করলেও চা বাগানে জন বারলার প্রভাব আর জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায়ের ভাবমূর্তি বিজেপিকে কিছুটা অ্যাডভান্টেজ দিচ্ছে। চা বাগানে একল স্কুল খুলে, একের পর এক মন্দির তৈরি করে আদিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে আরএসএস যেভাবে প্রভাব বাড়িয়েছে তার সুফল বিজেপি ইভিএমে টেনে আনতে পারলে জলপাইগুড়ির একাধিক বিধানসভা তাদের দখলে আসতে পারে। তবে অন্য জেলার মতো এখানে তাদের নেতৃত্বে মুখের অভাব। বারলা ছাড়া চা বলয়ে তাদের দ্বিতীয় মুখ নেই। পেশায় চিকিৎসক জয়ন্তবাবু দিল্লিতে অনেকটা সময় থাকেন বলে জেলা রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব খুবই কম। সেই সুযোগে বাপি গোস্বামীর মতো মাঝারি নেতারা শহরে দল চালাচ্ছেন। তাঁদের নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি এতটাই যে, বহু এলাকায় বিজেপির সংগঠনই গড়ে ওঠেনি। ফলে ওপরতলায় অনেকটা সাজানো গোছানো হলেও জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক ভিত কিন্তু খুব একটা পোক্ত নয়।