জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : জেলার অন্যতম প্রাচীন ভবন হয়ে এখনও হেরিটেজের সম্মান পায়নি জলপাইগুড়ি জেল। নানা সময়ে নানা পরিচিতি থাকা এই জেলের বর্তমান পরিচয় কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার। বিষয়টি নিয়ে নাগরিকরা সরব হলেও এর জবাব নেই কারও কাছেই।

১৮৬৯ সালে বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলার জন্ম হয়। সেসময় এই এলাকাটি রাজশাহি ডিভিশনের অন্তর্গত ছিল। এই ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার ছিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুর। পরে ১৮৭৬ সালে বহরমপুর থেকে জলপাইগুড়িতে হেডকোয়ার্টার সরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ডিভিশনের যাবতীয় ফৌজদারি মামলার শুনানি রংপুর আদালতে হত। সেসময় রংপুরে ম্যালেরিয়া ও সাপের উপদ্রব ছিল। এরপরেই সেখান থেকে জলপাইগুড়িতে আদালত সরিয়ে আনা হয়। যার ফলে ১৮৮৩ সালে জলপাইগুড়ি জেল তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর এই জেলের পরিচয় ছিল ডিস্ট্রিক্ট জেল হিসেবে। শেষপর্যন্ত ২০০১ সালের ৪ মার্চ একে সেন্ট্রাল জেল করা হয়। প্রায় এক দশক আগে জলপাইগুড়ি জেলের প্রধান ভবনকে হেরিটেজ তকমা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। আপাতত জেলের প্রাচীন ভবনটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্লক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এতদিনের প্রাচীন হলেও ভবনটি যথেষ্টই শক্তপোক্ত। ভবনের কারিগরি দিক পর্যালোচনা করার জন্য রেস্টোরেশন ইঞ্জিনিয়ারের তদারকির প্রযোজন থাকলেও সরকারি উদ্যোগ নেই।

জলপাইগুড়ি জেলের প্রায় ১৩৬ বছরের ইতিহাসে বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে। ইংরেজ আমলে বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলার পাতলাখাওয়ার বাসিন্দা নয়ন কাপালিকের ফাঁসি হয়েছিল জলপাইগুড়ি জেলে, যা এই জেলের প্রথম ফাঁসি। তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার চা বলয়ে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা ছিল। অন্য মামলাও হত প্রচুর। জলপাইগুড়ির লাগোয়া তৎকালীন প্রোটেক্টেড স্টেট সিকিমের অবস্থান। এই সব দেখেই ইংরেজ সরকার রাজশাহি ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার জলপাইগুড়িকে করেছিল। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের প্রাক্তন অধ্যাপক আনন্দগোপাল ঘোষের নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকার সময়ে আমি জলপাইগুড়ি জেলখানার তথ্য সংগ্রহ করে হেরিটেজের ছাড়পত্র প্রাপ্তির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এনেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার পরে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।  জলপাইগুড়ি জেল চত্বরে প্রচুর জমি রয়েছে। ফলে জেল ভবনকে ঘিরে কোনো হেরিটেজ প্রোজেক্ট নেওয়া হলে জমির সমস্যা হবে না।

এ প্রসঙ্গে শহরের প্রবীণ বাসিন্দা ভূপেন দাস বলেন, জলপাইগুড়ি জেলখানার ইতিহাস প্রকাশ করা জরুরি। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়ে কাছে ইংরেজ আমলে জলপাইগুড়ি জেলখানার কী চেহারা ছিল, তা প্রমাণ সহ তুলে ধরা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রদীপ দে বলেন, সকলেরই নিজের এলাকার ইতিহাস ভালোভাবে জানা দরকার। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে বহু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এই জেলে বন্দি ছিলেন। আমরা চাই জলপাইগুড়ি জেলের ভবনকে দ্রুত হেরিটেজের মর্যাদা দেওয়া হোক। সমাজ ও নদী বাঁচাও কমিটির আহ্বায়ক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ছাত্রছাত্রী সহ সমাজের সকলের কাছে ঐতিহ্যের স্বাক্ষরবাহী জলপাইগুড়ি জেলের প্রাচীন ভবনের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে।