দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির স্বার্থে দেহ দানে অঙ্গীকারবদ্ধ চিকিৎসক পরিবার

423

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য জীবিতাবস্থা তেই মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন বাবা। সেইমতো বাবা নারায়ণচন্দ্র ঘোষের মৃত্যুর পর বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ‘অ্যানাটমি’ বিভাগে দেহ তুলে দিয়েছেন সন্তান সন্ততিরা। শুধু এইটুকু করেই দায়িত্ব সারেননি স্ত্রী পুষ্পদেবী, পুত্র উৎপল ঘোষ ও পুত্রবধূ চম্পা ঘোষ। নারায়ণবাবুর দেখানো পথে হেঁটে তাঁরাও মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করে ফেলেছেন। এমনকি নারায়ণবাবুর স্কুল পড়ুয়া নাতি-নাতনিও একই পথের পথিক হওয়ার শপথ ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে।

পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর থানার আবুজহাটি ১ পঞ্চায়েতের পাঁচশিমুল গ্রামে বসবাস করেন ঘোষ পরিবারের সদস্যরা। পরিবার কর্তা নারায়ণচন্দ্র ঘোষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। গত ৮ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনের জন্য মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তিনিই এখন এলাকাবাসীর কাছে পথ প্রদর্শক হয়ে উঠেছেন।

- Advertisement -

নারায়ণবাবুর ছেলে উৎপল ঘোষ জানিয়েছেন, জীবিতাবস্থায় তাঁর বাবা সবসময় চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি চর্চা চালিয়ে যেতেন। অন্য চিকিৎসকদের সঙ্গেও সেইসব বিষয় নিয়ে আলোচনাও করতেন তিনি। নারায়ণবাবু সবসময়েই চাইতেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আরও উন্নতি ঘটুক এই ভারতবর্ষে। কেউ ডাক্তারি পড়ছে জানলে তাকেও তিনি অনুপ্রাণিত করতেন। উৎপলবাবু জানান, তাঁর বাবা মনে করতেন, চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের জন্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য মরণোত্তর দেহ দান অত্যন্ত জরুরি। সেই ভাবনা থেকেই মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ‘অ্যানাটমি’ বিভাগে নারায়ণচন্দ্র ঘোষ মরণোত্তর দেহ দানের লিখিত অঙ্গীকার করেন। সেই অঙ্গীকারকে মান্যতা দিয়ে তাঁরা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে ৮ জানুয়ারি বর্ধমান হাসপাতালের ‘অ্যানাটমি’ বিভাগে বাবার মৃতদেহ তুলে দেন।

মৃত চিকিৎসকের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী পুষ্পদেবী জানান, মৃত্যুর পর দেহ দাহ করে দিয়ে আখেরে কোনও লাভই হয় না। বরং সেই দেহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য দেশের ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া অনেক বেশি জরুরি। সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাঁর ছেলে উৎপল ও বৌমা চম্পা চার বছর আগেই দেহ দানের অঙ্গীকার সম্পন্ন করে ফেলেছেন। আর স্বামীর দেখানো পথে হেঁটে স্বামীর মৃত্যুর পাঁচদিন পরে তিনিও স্বেচ্ছায় মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানান পুষ্পদেবী।

উৎপলবাবু জানান, তিনিও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন। তাই নিজের বাবার দেখানো পথকেই শ্রেয় বলে মনে করে তিনিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করেছেন। উৎপলবাবুর স্ত্রী চম্পাদেবী জানান, তিনি পেশায় আশাকর্মী। শ্বশুর মশাইয়ের দেখানো পথকেই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন। সেকারণেই তিনিও জীবিতাবস্থাতেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার সম্পন্ন করে ফেলেছেন।

দাদু ও মা-বাবার মতোই মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করতে চায় ছোট্ট রোদ্দুর ঘোষ ও শ্রুতি ঘোষ। তারা জানিয়েছে, সাবালক হয়ে দাদু, ঠাকুমা ও বামা-মায়ের দেখানো পথে হেঁটে তারাও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করার সিদ্ধান্ত এখন থেকেই নিয়ে ফেলেছে। ঘোষ পরিবারের সকল সদস্যদের এমন মহতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এলাকার জনমানসে সাড়া ফেলে দিয়েছে।

ঘোষ পরিবারের সদস্যদের এমন চিন্তাভাবনার তারিফ করেছেন জামালপুর ব্লকের বিডিও শুভঙ্কর মজুমদার। তিনি বলেন, ‘অভিনব চিন্তাভাবনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য পরিবারের একজনের দেখানো পথ অনুসরণ করে পরিবারের সবার মরণোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার বদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এককথায় অনবদ্য। এমন চিন্তাভাবনার বিষয়ে সাধারণের মধ্যে সমমনস্কতা তৈরি হলে সত্যি আমাদের দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান সমৃদ্ধ হবে।’

ঘোষ পরিবারের সদস্যদের এমন চিন্তাভাবানার কথা জেনে অবিভূত বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডেপুটি সুপার কুণালকান্তি দে। তিনি বলেন, ‘ঘোষ পরিবারের সদস্যদের এমন প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা বাস্তবেই একটা নিদর্শন। ওঁনারা পথপ্রদর্শক। এমন প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা সবার মধ্যে দেখা দিলে ডাক্তারি নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীরা যেমন উপকৃত হবে তেমনই চিকিৎসা বিজ্ঞান সমৃদ্ধ হবে।’