সিদ্ধেশ্বরীর পুজোয় ডালা দেন সিরাজুলরা

রণবীর দেব অধিকারী, ইটাহার : গ্রামের শেষে আমবাগান। তারপর বিস্তীর্ণ ধানের জমি। দুচোখ যতদূর নজর যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দূরে, নির্জন মাঠের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো উঁচু একটা ঢিবি, জঙ্গলাকীর্ণ। সেখানেই সিদ্ধেশ্বরী দেবীর থান।

এই বিস্তৃত ধানখেত পেরিয়ে অতদূর পৌঁছানো যায় কীভাবে? এক যুবক এসে বললেন, কোথায় যাবেন? সিদ্ধেশ্বরীর থানে? ওদিকটায় খুব কাদা। এদিক দিয়ে যান। যুবকের দেখানো পথে পা বাড়ালাম। দুপাশে কোমর সমান ধানগাছ। খেতের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু আলপথ। আলের গায়ে ছোট ছোট অজস্র গর্ত। গর্তগুলো ইঁদুরের হলেও তাতে গোখরো থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে সাপের দেখা না মিললেও আচমকা চোখে পড়ল আস্ত একটি শেয়াল। ঘাড় উঁচিয়ে এক ঝলক দেখেই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে ঢুকে পড়ল পাশের ধানখেতে। কী জানি! হয়তো ভাবল, মানুষ তার চেয়ে ভয়ংকর।

- Advertisement -

আলপথে ব্যালেন্সের খেলা খেলতে খেলতে মিনিট দশেক হাঁটার পর অবশেষে গিয়ে উঠলাম সেই ঢিবিতে। চারপাশ দেখে মনে হয়, যেন নিভৃত সাধনার কোনও সিদ্ধস্থান। অথচ না আছে মূর্তি, না আছে মন্দির। জঙ্গলে ঢাকা পাকুড় গাছের গোড়ায় লাল রং-এর একটা বেদি। বেদির সামনে লেখা ওঁ। চারপাশে নিম, জিগার, হিজল, বেল, পাকুড় সহ অজস্র নাম না জানা লতাগুল্ম আর ঝোপঝাড়। এদিকটায় সচরাচর কেউ পা মাড়ায় না। সারা বছর ঝাঁট পড়ে না, প্রদীপ জ্বলে না সন্ধ্যায়। বনবাদাড়ে বছরভর অযত্নে পড়ে থাকা এই বেদিতেই অধিষ্ঠান করেন সিদ্ধেশ্বরী। প্রায় ২০০ বছর ধরে এই চালচুলোহীন বেদিতেই সিদ্ধেশ্বরী রূপে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। এই পুজোর প্রথম খোঁজ দিয়েছিলেন বানবোল হাইস্কুলের শিক্ষক সন্দীপকুমার ঝা।

পুজোটা আসলে তাঁদেরই ঝা বংশের পূর্বপুরুষদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। পুজোর ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেল বর্তমানে বংশের প্রবীণতম ব্যক্তি খোকন ঝায়ের মুখ থেকে। আশি ছুঁইছুঁই খোকনবাবু জানালেন, আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে তাঁদের বসত ছিল এই ধুলোহর গ্রামে। সেই সময়ে তাঁদের চতুর্থ পূর্বপুরুষ তারাচরণ ঝা এই পুজোর প্রতিষ্ঠা করেন। একবার কলেরায় গোটা গ্রাম উজাড় হতে বসেছিল। মহামারির হাত থেকে রেহাই পেতে তারাচরণ ও তাঁর পরিজনরা ধুলোহরের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যান কয়েক ক্রোশ দূরে সুই নদীর ওপারে গুলন্দর গ্রামে। ধুলোহরে তাঁদের বসতভিটের চিহ্ন বলতে আজ আর কিছু নেই। জনহীন প্রান্তরে শুধু পড়ে আছে সিদ্ধেশ্বরীর থান।

খোকনবাবু বলেন, গুলন্দরে চলে আসার পর বেশ কিছু বছর সেখানে পুজো দেওয়া বন্ধ ছিল। একদিন আমার ঠাকুরদার বাবা তারাচরণ ঝা স্বপ্নে দেখলেন, মা এসে তাঁকে বলছেন, তোরা যে আমাকে এখানে জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে গেলি, আমার পুজো দেবে কে? ফুল-জল আর পাঁঠাবলি দিয়ে আমার পুজোর ব্যবস্থা কর। স্বপ্নাদেশের পর ওই বছর থেকে ফের সেই বেদিতে গিয়ে যথানিয়মে পুজো দেওয়া শুরু হয়। সেই থেকে আজও প্রতি বছর তারাচরণ ঝায়ের বর্তমান বংশধরেরা গুলন্দর থেকে নদী পেরিয়ে ধুলোহরের মাঠে গিয়ে অষ্টমী ও নবমীতে নির্দিষ্ট উপচারে পুজো দেন সিদ্ধেশ্বরীর থানে। সন্দীপ ঝা জানালেন, এখনও পুজোর এই দুইদিন এখানে বহু মানুষের সমাগম হয়। অনেক মানুষ আসেন পুজো দেখতে। প্রচুর ডালা পড়ে। নবমীর দিন একাধিক পাঁঠাবলি হয়। ধুলোহর ছাড়াও পাশের হাটগাছি, বৃন্দাবাড়ি আজগুবিপাড়ার মানুষও অনেকে আসেন। মুসলিম পরিবারের মানুষরাও কেউ কেউ ডালা দেন। একটা সম্প্রীতির বার্তা বহন করে আমাদের বংশের এই সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো।

একই বক্তব্য শোনা গেল আজগুবিপাড়ার সিরাজুল হকের মুখেও। সিরাজুল বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই এই পুজো দেখে আসছি। গ্রামের সবাই শ্রদ্ধার চোখেই দেখেন এই সিদ্ধেশ্বরী দেবীকে। আর পাঁচটা প্রাচীন পুজোর মতো সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজোতেও জড়িয়ে আছে নানা রকম অলৌকিক কাহিনী। সেই গল্পও শোনালেন খোকন ঝা। তিনি জানালেন, আগে এই তল্লাটে বাঘ ঘোরাফেরা করত। বাবার কাছে গল্প শুনেছি, একবার পুজো দিতে গিয়ে বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবারের লোকেরা। পুজো দিতে যাওয়ার সময় সকলে দেখেন, মেঠো পথে একটি বাঘ বসে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কাউকে আক্রমণ না করে সেই বাঘ গিয়ে উঠে বসে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর থানে। পুজো শেষ হওয়ার পর ভোগ খেয়ে আবার মিশে যায় জঙ্গলে। খোকনবাবু জানান, দেবীর স্বপ্নাদেশেই এখানে কোনও মন্দির গড়ে তোলা হয়নি। একবার বেদির ওপরে একটি চালা নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই চালা নিজে নিজেই ভেঙে পড়ে। ওই রাতেই দেবী স্বপ্নাদেশে বলেন, আমার মাথার ওপরে কোনও ছাদ দিবি না। আমি মন্দিরে থাকতে চাই না।