করোনা কেড়েছে পেশা, রাস্তার দোকানে আশা

169

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : কোভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে আর্থিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রচুর মানুষ কাজকর্ম হারিয়ে বেকার  হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে, পরিযায়ী শ্রমিক ও বেসরকারি  সংস্থা বা দোকান-বাজারে কাজ করা অসংখ্য মানুষ তাঁদের জীবিকা হারান। নতুন করে যে ফের পুরোনো পেশায় ফিরবেন, সেই উপায়ও সকলের নেই। আবার পরিযায়ী শ্রমিকরা যে ফের সকলে বাইরে গিয়ে কাজ করবেন, সেই অবস্থাও অধিকাংশের নেই। ফলে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে অনেকেই বিকল্প পেশাকে বেছে নিয়েছেন। আবার অনেকে বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে ছোট দোকান দিয়ে কোনওভাবে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজছেন।

কোচবিহার শহর ও শহরতলিও এর বাইরে নয়। লকডাউনের আগে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান থাকলেও লকডাউনের পরে কোচবিহার শহর ও শহরতলির মধ্য দিয়ে যাওয়া তোর্ষা নদীর বাঁধের উপর প্রায় আট কিলোমিটার রাস্তায় কয়েকশো দোকান গজিয়ে উঠেছে। কোচবিহার শহরতলির হরিণচওড়া থেকে শহর লাগোয়া খাগড়াবাড়ি পর্যন্ত তোর্ষা নদীর বাঁধের উপর দিয়ে বছরতিনেক আগে পাকা রাস্তা তৈরি হয়।  শহরের যানজট এড়াতে বিভিন্ন ছোট গাড়ি ও প্রচুর মোটর সাইকেল এই রাস্তাটি দিয়ে যাতায়াত করে। করোনা পরিস্থিতিতে কাজকর্ম হারিয়ে শহর ও শহরতলির প্রচুর মানুষ এখন এই রাস্তার দুধারে দোকান দিয়ে বাঁচার চেষ্টা শুরু করেছেন। ফলে যে রাস্তাটি এক-দেড় বছর আগেও সূর্যাস্তের পর কার্যত একেবারে শুনসান হয়ে পড়ত সেই রাস্তা এখন রাত পর্যন্ত দোকানের আলো আর লোকের ভিড়ে সরগরম হয়ে থাকছে। শহর ও শহরতলির কিছু মানুষের লাইফলাইন হয়ে উঠেছে এই রাস্তা।

- Advertisement -

বাঁধের ধারে একটি মুদির দোকানে বসে ছিলেন কোচবিহার কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আকাশ চৌধুরী। পাশে তাঁর মা ছিলেন। আকাশ জানান, বাবা তাঁদের সঙ্গে থাকেন না। দাদা বাইরে কাজ করতেন। লকডাউনে তিনিও কাজ হারিয়ে বাড়িতে চলে এসেছেন। লকডাউনে সংসারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় সংসার চালাতে তাঁরা কোনওভাবে এই দোকানটি দিয়েছেন। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি দোকান করেন। মাও তাঁকে এই কাজে সহযোগিতা করেন।

বাঁধের ধারে মুদির দোকানদার প্রমীলা সেন বলেন, আগে একটা চায়ের দোকান চালাতাম। কিন্তু লকডাউনে সেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী টোটো চালাতেন। অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ায় তিনিও ঘরে বসে রয়েছে। সংসার চালাতে এই দোকান দিয়েছি। বাঁধের ধারে একটি মণিহারি দোকানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছোট পারহান পারভিন বসে রয়েছে। সে জানায়, বাবা লেপতোশক বানানোর কাজ করেন। কিন্তু লকডাউনের সময় সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালাতে মা এই দোকান দিয়েছেন।

এমন দোকানিদের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকরাও আছেন। বাঁধের ধারে ফাঁসিরঘাট এলাকার পানের দোকানদার চিরন দাস বলেন, লকডাউনের আগে বাইরে কাজ করতাম। কিন্তু লকডাউনে কাজকর্ম হারিয়ে বাড়িতে চলে এসেছি। বাড়িতে বাবা, মা রয়েছেন। সংসার চালাতেই বাধ্য হয়ে এই দোকান দিয়েছি। কাজ হারিয়ে এখানে দোকান দিয়েছেন, এমন লোকের সংখ্যাও এখানে কম নয়। বাঁধের ধারে রাস্তার পাশে মাইক ও টিভি সারাইয়ের দোকানদার অমল বসুনিয়া বলেন, লকডাউনের আগে শহরের চকবাজারে অন্য দোকানে কাজ করতাম। কিন্তু লকডাউনের সময় কাজ চলে যায়। সংসার চালাতে শেষে এখানে এই দোকান দিয়েছি। এছাড়াও রাস্তাটির ধারে নতুন করে আরও বেশ কিছু দোকান হতেও দেখা যাচ্ছে।

শুধু এই বাঁধের রাস্তার ধারে নয়, শহরের বিভিন্ন অলিগলিতেই এখন নানারকম ছোট দোকান গজিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও নতুন নতুন প্রচুর ফলওয়ালা, সবজি বিক্রেতাদের ভ্যান গাড়ি করে শহরের বুকে ব্যবসা করতে দেখা যাচ্ছে। শহরে নতুন করে প্রচুর ফুল বিক্রেতাও দেখা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে লকডাউন যে বহু মানুষের পেশা পরিবর্তন করে দিয়েছে, তার ছবিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কোচবিহার শহরে।