শিক্ষকতা ছেড়ে জয়েন্ট বিডিও হলেন রায়গঞ্জের গৃহবধূ

6684

দীপঙ্কর মিত্র,রায়গঞ্জ: নিজের চেষ্টা এবং একাগ্রতা থাকলে যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় তা দেখিয়ে দিলেন রায়গঞ্জের এক গৃহবধূ। সাধারণ মানুষের সেবা করার ব্রতকে সামনে রেখে ২০১৫ সাল থেকে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্ততি শুরু করেন রায়গঞ্জের দক্ষিণ বীরনগরের বাসিন্দা রুপা গুপ্তা। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে তিনি প্রাথমিকের চাকুরি পর্যন্ত ছেড়ে দেন। এরপর বাড়িতে রাত-দিন নিজেকে পড়াশোনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখেন এবং সেইসঙ্গে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্ততি দিতে থাকেন। তিন বছরের আপ্রাণ চেষ্টার পর ২০১৮ সালে রুপাদেবী ডাব্লুবিসিএস-এর জয়েন্ট বিডিওর লিখিত পরীক্ষায় সফল হন। দীর্ঘদিন পর লকডাউনের আগে কলকাতায় মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। গত ৪ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল বের হলে দেখা যায় রুপাদেবী জয়েন্ট বিডিওর পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গে ১৬ নম্বর র‍্যাংক করেছেন। সাধারণ পরিবারের একজন গৃহবধূ কোনও রকম কোচিং ছাড়াই শুধুমাত্র নিজের চেষ্টায় ও একাগ্রতায় উচ্চশিখরে পৌঁছানোয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন।

রায়গঞ্জের কুমারডাঙ্গীর বাসিন্দা রুপা গুপ্তা রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি অনার্স এবং উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসটেন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বাবা শম্ভু প্রসাদ গুপ্তা মারা যাওয়ার পর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। কিন্ত মা, ঠাকুমা ও মামাদের অনুপ্রেরণায় চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ২০১১ সালে প্রাথমিক শিক্ষকতার চাকুরি পেয়ে যান। এরপর করণদিঘির ঝাড়বাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহ শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেন। কিন্ত মনের ইচ্ছা পূরণ হল না। ইচ্ছে তাঁর উচ্চপদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সেবাদান। প্রায় চার বছর শিক্ষকতার চাকুরি করার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় আরও বেশি নিজেকে উপযোগী করে তোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালের শেষের দিকে চাকুরি ছেড়ে পড়াশোনায় নিজেকে আরও বেশি মনোনিবেশ করে তোলেন।

- Advertisement -

এদিকে ২০১৬ সালে মা সরিতাদেবী ও ঠাকুরমা সারদা দেবী গুপ্তা মেয়ের বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে রায়গঞ্জের দক্ষিণ বীরনগরের বাসিন্দা পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক নয়ন কুন্ডুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধণে আবদ্ধ হন রুপাদেবী। তবে বিয়ের আগে শর্ত ছিল একটাই, তাকে স্বাধীনভাবে পড়াশোনার অধিকার দিতে হবে। সেই শর্ত মেনে নিয়েই নয়নবাবু স্ত্রী রুপাদেবীকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব সামলোনোর পাশাপাশি নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পড়াশোনা চালিয়ে যান। রুপাদেবী জানান, আমার প্রথম থেকে ইচ্ছে ছিল একটা সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার। ভেবেছিলাম প্রাইমারী স্কুলে চাকুরির পাশাপাশি সিভিল সার্ভিসের জন্য প্রস্ততি নেব। কিন্ত কোনও গাইডেন্স ছিল না, আইডিয়া ছিল না। অনলাইনে প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল না। তাই সেভাবে প্রস্ততি নিতে পাচ্ছিলাম না।

তিনি জানান, প্রথম দিকে এসএসসি, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের স্টাফ সিলেকশন সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্ততি নিতে থাকি। প্রথম পর্যায়ে দুবার লিখিত পরীক্ষায় পাশও করি। ২০১৫ সাল থেকে সিদ্ধান্ত নিই অন্য কোনো পরীক্ষা নয় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্ততি নেব। কারণ, এক সঙ্গে সব পরীক্ষার প্রস্ততি নিলে কোনোটাই হবে না। সেই মতো পড়াশোনা শুরু করি।

রুপাদেবী জানান, ২০১৬ সালে বিয়ের জন্য কিছুটা পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। ২০১৮ সালে জয়েন বিডিও পরীক্ষার প্রিলি ও মেইন হয়। আমি সফল হই। এবছর লকডাউনের আগে কলকাতায় ইন্টারভিউ দিতে যাই। গত ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রেজাল্ট বের হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে জয়েন্ট বিডিও-র যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে ৪৭ জনের মধ্যে আমি ১৬ নম্বরে রয়েছি।

তিনি বলেন, আমার মা মানুষের সেবা করতে খুব ভালোবাসেন। তাঁর এবং ঠাকুরমার অনুপ্রেরণা এবং মামাদের গাইডেন্স মতো সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এই সফলতা পেয়েছি। তবে আমার স্বামী এক্ষেত্রে আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। যখন সরকারি চাকুরি পাওয়া দুষ্কর সেসময় রুপাদেবী শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে দেওয়ায় প্রথমের দিকে কেউই মেনে নিতে পারেননি। পরে অবশ্য রুপাদেবীর একাগ্রতা দেখে তাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। রুপাদেবীর স্বামী নয়নবাবু স্ত্রীর সাফল্যে খুশি। আগামীদিনে তিনি যাতে আরও উচ্চশিখরে যেতে পারেন তার কামনা করেছেন তিনি।