দারিদ্রতাকে হার মানিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা জয় বিক্রমের

5060

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: নিজের ইচ্ছা শক্তি, অধ্যাবসায় ও মানসিক দৃঢ়তা যদি থাকে তাহলে দারিদ্র্যতা ও অন্য কোনো প্রতিকূলতা একমাত্র বাধা হতে পারে না তা দেখিয়ে দিল বিক্রম। সমস্ত কিছুকে হার মানিয়ে এবছর ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। বর্ধমান মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ভর্তির জন্য ইতিমধ্যে রওনা দিয়েছে বিক্রম।

ইটাহার ব্লকের বানবোলের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা বিক্রম পাল ছোটোবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। দক্ষিনাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার পাঠদান শুরু হয়। এরপর সে পঞ্চম শ্রেনিতে ভর্তি হয় স্থানীয় বানবোল হাই স্কুলে। সেখান থেকে ৬৪২ নম্বর মাধ্যমিক পাস করার পর সে ভর্তি হয় রায়গঞ্জের দেবীনগর কৈলাস চন্দ্র রাধারানী উচ্চ বিদ্যাপীঠে। বিক্রম বিজ্ঞান বিভাগে হয় এই বিদ্যালয়ে। ২০১৭ সালে ৪৪৭ নম্বর নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে সেখান থেকে।

- Advertisement -

এরপরই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায় বিক্রম। কারন পরিবারের পক্ষে তাকে বাইরে রেখে পড়ানো সম্ভব ছিল না। মাটির সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করত বিক্রমের পরিবার। কিন্তু দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং মাটির বাসনপত্রের চাহিদা কমে আসায় বিক্রমের বাবা নীরেন্দ্রনাথ পাল সেই পেশা থেকে সরে এসে বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি মুদিখানার দোকান করেন। স্ত্রী প্রমীলাবালা পালকে সঙ্গে নিয়ে দোকান চালিয়ে কোনোরকম সংসার চালান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস ছিল ছোট্ট দোকান।

অভাব থাকা সত্ত্বেও দুই সন্তানের পড়াশোনার জন্য কোনো খামতি রাখেননি বাবা নীরেন্দ্রনাথ পাল এবং মা প্রমিলা বালা পাল। বিক্রম রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। কিন্তু জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। এবছর নিট পরীক্ষায় ৭২০ নম্বরের মধ্যে ৬০০ নম্বর পায় সে।তাঁর সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্কিং হয়েছে ২০১৬৩ এবং পশ্চিমবঙ্গের ৯৩৫। এই অবস্থায় খুশির ছোঁয়া সমগ্র সোনাপুর গ্রামে।

বিক্রমের এই সাফল্যে খুশি বানবোল ও দেবীনগর কৈলাস চন্দ্র রাধারানী উচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। বানবোল হাই স্কুলের সহকারি প্রধানশিক্ষক চন্দ্র নারায়ন সাহা বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র বিক্রম। সে প্রথম আমাদের বিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে।তাই তাঁর সাফল্যে আমরা খুব খুশি।‘

দেবিনগর কৈলাস চন্দ্র রাধারানী বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক উৎপল দত্ত বলেন, ‘এবছর আরও দু’জন আমাদের বিদ্যালয় থেকে মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। সেজন্য আমরা সকলেই খুশি। তবে বিক্রমের সাফল্যের পুরো কৃতিত্বটাই তুলে দিয়েছেন বানবোল হাই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের উপর।‘

বিক্রম জানায়, আজ আমি যেখানে পৌঁছেছি, ‘এর পেছনে বানবোল হাই স্কুলের অবদান সত্যি অপরিসীম। ২০১৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমি রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় জুলজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু ইচ্ছা ছিল মেডিকেল লাইনে যাওয়ার। সেই ইচ্ছাপূরণ না হওয়ায় মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্ত চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে লক্ষ্যে পৌঁছানোর। সেই চেষ্টা সফল হওয়ায় আজকে আমি ভীষণ খুশি। ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে সাধারন মানুষের সেবা করব এটাই এখন একমাত্র ব্রত।‘

বাবা নীরেন্দ্রনাথ পাল বলেন, ‘ছোট্ট মুদিখানা দোকান চালিয়ে ছেলেকে পড়াতে পারবো কিনা জানিনা। তাই সরকারি সহযোগিতা পেলে ভালো হতো। বিক্রম ভবিষ্যতে নিউরোসার্জন হতে চায়। চোখে তাঁর অসীম স্বপ্ন, বুকে তাঁর প্রত্যাশা। তাই বাধা যতই আসুক না কেন লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিক্রম আজ রওনা দিয়েছে বর্ধমানের উদ্দ্যেশ্যে।‘