জঙ্গলমহলে বিক্ষুব্ধরা হারিয়েছে তৃণমূলকে, মত ছত্রধরের

227

কলকাতা : জঙ্গলমহলে তৃণমূলের ওপর মানুষ বীতশ্রদ্ধ হওয়াতেই বিজেপি জিতেছিল। সদ্য তৃণমূলে যোগ দিয়ে রাজ্য কমিটির অন্যতম সম্পাদক পদ পাওয়া ছত্রধর মাহাতো এমনই মনে করেন। মাওবাদী সন্দেহে দীর্ঘদিন জেল খাটার পর ছাড়া পেয়ে লালগড়ের আমলিয়া গ্রামে নিজের বাড়িতেই আছেন এক সময়কার জনসাধারণের কমিটির নেতা ছত্রধর। বাম আমলে দাপুটে সরকারের হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন এই নেতা। তৃণমূলের রাজ্য কমিটিতে তাঁর নাম ঘোষণার পর থেকেই বাড়িতে কাতারে কাতারে মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে আসছেন। সংগঠনের কাজে এখনও মাঠে নামেননি ছত্রধর। সবে নতুন জেলা কমিটির প্রথম বৈঠকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। কিন্তু জঙ্গলমহলের প্রত্যেক মানুষ সম্পর্কে তাঁর কাছে খবর রয়েছে। বলেন, এখানে তৃণমূলই তৃণমূলকে হারিয়েছে। যারা এখন বিজেপি করে, তারা সবাই আমার এককালের জনসাধারণের কমিটির সঙ্গী। এদের সঙ্গে বিজেপির আদর্শের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আচরণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এরা তৃণমূলকে জেদ করে হারিয়েছে।

জেল থেকে বাড়িতে ফিরে ছত্রধর বোঝার চেষ্টা করেছেন, কীভাবে বদলে গেল জঙ্গলমহলের অঙ্ক। কীভাবেই বা এখানে বিজেপির এই বাড়বাড়ন্ত। ছত্রধর বলেন, ‘এখানে উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার অনেক খরচ করেছে। অনেক ভালো ভালো প্রকল্পে অনেক মানুষ উপকার পেয়েছেন। কিন্তু তৃণমূলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষকে সম্মান দেয়নি। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। বড় রাস্তায় মিটিং-মিছিল করেছে। কিন্তু মহল্লায় মহল্লায় ঢুকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেনি। বিজেপি তো সারাদিনে একশো এক রকমের মিথ্যা প্রচার করে যাচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল সহ অন্য কোনও দল মানুষের ভুল ভাঙিয়ে দিতে তাঁদের কাছে যায়নি। এইখানেই বড় খামতি রয়ে গিয়েছে।’ শুধুই কি সম্মানে ঘাটতি? আর কোনও সমস্যা নেই? ছত্রধর বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় পরিষেবা দেওয়ার নামে তোলা আদায় হয়েছে। এটা সাধারণ মানুষের চোখে দৃষ্টিকটু তো লাগবেই। এই সমস্যা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু সেই দুষ্ট লোকগুলিকে বেছে সরিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল। তা না হওয়ায় দলের নাম খারাপ হয়েছে।’

- Advertisement -

ছত্রধরের মতে, জঙ্গলমহলের জনজীবনকে অন্য জায়গার সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। আমলা ও জনপ্রতিনিধিদের স্থানীয়স্তরে প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়নের ধারায় বদল আনতে হবে। বলেন, ‘এখন সরকারের তরফে ক্লাবগুলিকে অর্থসাহায্য করা হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যেসব ক্লাবের নামে সাহায্য দেওয়া হল, তার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে ক্লাবগুলির অস্তিত্বই নেই। এভাবে সরকারের টাকারও অপচয় হল, তা এলাকার মানুষের কাজেও এল না। এর বদলে যদি ব্লকস্তরে আবাসিক, শিক্ষা ও খেলাধুলার কেন্দ্র করা যায় তা এলাকার ছেলেমেয়েদের কাজে আসবে। একটি ব্লকে ৫০টি ক্লাবকে ২ লক্ষ করে টাকা দেওয়ার বদলে এক কোটি টাকায় যদি এরকম আবাসিক কেন্দ্র করা যায় তাহলে ৩০ থেকে ৫০ জন ছেলেমেয়েকে সেখানে রাখা যেতে পারে। ৮ থেকে ১২ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদেছের প্রশিক্ষণ দিলে তার মধ্যে থেকে ব্লকপিছু ১০ জন ভালো ছেলেমেয়ে বেরিয়ে আসবে। তারা সবাই ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর শহর বা কলকাতায় পড়াশোনা বা খেলাধুলার সুয়োগ পাবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন আদিবাসীরা ছোট বয়সেই ১০-১২ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করে সংসার পাতে। তিন-চারমাসের বাচ্চাকে জঙ্গলে বসিয়ে রেখে স্বামী-স্ত্রী ব্যাগ নিয়ে কাঠ, পাতা কুড়োতে বেরোয়। কখনও বা খাবারের সন্ধানে গোসাপ মারে। শিক্ষার আলো পৌঁছোলে এভাবে এখানকার ছেলেমেয়েরা মূলস্রোতে মেশার সুযোগ পাবে। তাদের জীবনধারাটাই বদলে যাবে।’

আপাতত ছত্রধর অবশ্য বেশ চিন্তায় তাঁর নতুন দায়িত্ব নিয়ে। বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমার নজর ২১-এর বিধানসভায়। সেইজন্যই আমাকে আনা হয়েছে। সাংগঠনিক দিকটা বেশি করে দেখতে হবে। যেসব এলাকায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি, সেখানকার ক্ষোভ-বিক্ষোভ, সমস্যা মেটাতে হবে। তাহলেই তার পরের ধাপে ঠিক পথে উন্নয়নের দিকে এগোতে পারব।’

তথ্য- পুলকেশ ঘোষ