সংস্কার ভেঙে অসহায়ের শেষযাত্রায় সঙ্গী কাবেরী

134

তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : তিনি যেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ে লেখা ছোটগল্প লালু-র গোপাল খুড়ো। তবে বাস্তবের এই গোপাল খুড়ো কিন্তু পুরুষ নন, তিনি মহিলা। কুসংস্কারকে দূরে ঠেলে মৃতদেহ দাহ করার সামাজিক দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন শিলিগুড়ির কাবেরী চন্দ সরকার। পেশায় ল্যাব টেকনিসিয়ান উত্তর ভারতনগরের বাসিন্দা, বছর চল্লিশের এই মহিলা এখনও পর্যন্ত দুশোরও বেশি মৃতের দেহ দাহ করেছেন। দিনে-রাতে যখনই ডাক পড়ে উপস্থিত হয়ে যান তিনি। সাদা পোশাক পরে গলায় গামছা দিয়ে শবদেহ শ্মশানে নিয়ে যেতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। বরং তাঁর কথায়, এই কাজের মতো পুণ্যের কাজ সংসারে আর নেই। তাই যতদিন পারবেন এই কাজই করতে চান তিনি। তাঁর এই কাজে ইতিমধ্যেই উপকৃত হয়েছে বহু পরিবার। অনেকে আবার মজা করে মৃত্যুর পর শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে আগাম অনুরোধ জানিয়েছেন।

দেশবন্ধুপাড়ার বাসিন্দা দীপক পাল (পরিবর্তিত নাম) কর্মসূত্রে লন্ডনের বাসিন্দা। শিলিগুড়ির বাড়িতে বাবা মারা যাওয়ার খবর ফোনে পেলেও বাড়িতে আসতে পারেননি। বাবার দেহ শ্মশানে নিয়ে যাবেন কে? লন্ডন থেকেই ফোন এল কাবেরীদেবীর কাছে। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দেশবন্ধুপাড়ায় ওই বাড়িতে হাজির। শবদেহ গাড়িতে করে শ্মশানে চললেন। এমন আরও অনেক পরিবারের সমস্যা মিটিয়ে দিয়েছেন কাবেরীদেবী। বিশেষ করে, যে অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কাছে কেউ থাকেন না, তাঁদের সৎকারের প্রয়োজনে কাবেরীদেবী সবার আগে পৌঁছে যান।

- Advertisement -

এই পথচলা মোটেই সহজ নয়। এই কাজের জন্য প্রতিদিন অনেকের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হয়। এমনকি অনেক সময় তাঁর এই কাজ সংস্কারবিরোধী বলে বাধা দিয়েছেন অনেকে। তবে সমাজের একশ্রেণির লোকের এমন মন্তব্য বা কুসংস্কারে কান না দিয়ে নিজের কাজ করে চলেছেন কাবেরীদেবী। তিন বছরের মধ্যেই তিনি তৈরি করে নিয়েছেন শবদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য মহিলাদের একটি দল। কাবেরীদেবী বলেন, ছোট থেকেই বাবাকে দেখেছি মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে। তাই ছোটবেলায় যখন পাড়ার কেউ মারা যেতেন ছেলেদের সঙ্গে আমিও শ্মশানে গিয়ে হাজির হতাম। কোনওদিনই এই কাজকে ভয় পাইনি। পরবর্তীতে দেখেছি, অনেকই রয়েছেন যাঁদের দুঃসময়ে পাশে থাকার মতো কেউ নেই। সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ডিভিও কলের মাধ্যমে। এমনকি মারা গেলেও পরিবারের কেউ এসে হাজির হতে পারেন না। এমন কেউ মারা গেলে শবদেহ শ্মশানে নিয়ে যাই আমি। তবে এই কাজের জন্য কোনও টাকাপয়সা নেওয়া হয় না। তাই অনেক সময়ই আমাদের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। কারণ শবদেহ নিয়ে যাওয়ার গাড়ির টাকা, শ্মশানে দেহ দাহ করার ফি, কেউ বাড়িতে মারা গেলে তার ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য ডাক্তারের ফি- এত কিছু আয়োজন করার মতো টাকা তো আমাদের কাছে নেই। তাই কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা সহৃদয় ব্যক্তি যদি আমাদের প্রয়োজনে শবদেহের গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন, শ্মশানে শবদেহ দাহ করার ফি যদি আমাদের কিছুটা ছাড় দেওয়া হয় এবং কোনও চিকিৎসক যদি আমাদের ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য ফি ছাড় দেন তাহলে আমরা খুবই উপকৃত হব।

কাবেরীদেবীর আক্ষেপ, শ্মশানে গিয়ে আমাদের মতো মহিলাদের অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। সেজন্য প্রশাসনের তরফে আমাদের যদি কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া হয় তাহলে আমাদের কোনও অসুবিধা হবে না। কাবেরীদেবীর এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্যামা দাস অধিকারী, ভারতী কাঞ্জিলাল, অণিমা সরকার, দুলালি হালদার, শম্পালী বর্মন, মাম্পি দাস, নীলিমা বর্মন, জ্যোতিপ্রিয়া দাস, পায়েল মজুমদার, মাম্পি অধিকারীর মতো আরও মহিলা এই টিমে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছেন শ্মশানবন্ধু।