বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে কালিয়াগঞ্জের লিচু

70
প্রতীকী ছবি

অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ : রাত দশটা। লকডাউনের স্তব্ধতা গ্রাস করেছে কালিয়াগঞ্জ স্টেশন চত্বর। কাটিহার-রাধিকাপুরগামী প্যাসেঞ্জার প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই গুটিকয়েক মহিলা ও পুরুষ যাত্রী খালি বস্তা, ব্যাগ নিয়ে নেমেই টিকিট কাউন্টারের সামনে মশারি টাঙিয়ে বিছানা পাতা শুরু করলেন। অনেকে ঘুমিয়ে পড়লেন।কোথায় যাবেন আপনারা?

এখানেই রাত কাটাব। ভোর চারটে নাগাদ স্টেশন চত্বরে পাইকারি লিচুবাজার বসে যে। সেখান থেকে লিচু কিনে ফের ছটার ট্রেনে বাড়ি ফিরব। বাজারে লিচু বিক্রি হলে তবেই পরিবারের সকলের পেটে ভাত জুটবে। লকডাউনের বাজারে দুবেলা অন্ন জোগানোর ভরসা এই লিচু বিক্রির লভ্যাংশ।

- Advertisement -

বৈশাখের শেষ থেকে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ কালিয়াগঞ্জ স্টেশন চত্বর মূলত লিচু মান্ডি নামেই বিখ্যাত। বিহার ছাড়াও বালুরঘাট, গঙ্গারামপুর, মালদা, রায়গঞ্জ, ডালখোলা থেকে লিচু ব্যবসায়ীরা আসেন পাইকারি হারে লিচু কিনতে। ভোর চারটে থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত চলে এই ব্যবসা।

কালিয়াগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে লিচুবাগান। গাছে ফলন আসতেই হুন্ডার দরে গাছগুলি মালিকের থেকে ব্যবসায়ীদের কাছে হাত পরিবর্তন হয়। লিচু পাকতেই বাদুড়ের উত্পাত থেকে রক্ষা করতে মশারি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় গাছগুলি। লিচু চুরি রুখতে রাত জেগে চলে পাহারা দেওয়ার কাজ।

ট্রেনপথে বাংলার স্বাধীন পাল, মকসুদ আলি ছাড়াও বিহার থেকে লিচু কিনতে আসেন মুসমদ তালুদেবী, অঞ্জলিদেবীর মতো আরও অনেকে। সন্ধ্যা নামতেই বাড়িতে রাতের খাওয়া সেরে স্টেশনে এসে চলে ট্রেন আসার অপেক্ষা। গন্তব্য কালিয়াগঞ্জ।

বিহারের শালমারির বাসিন্দা অঞ্জলিদেবী। বললেন, এবারে প্রথম হাতেখড়ি এই ব্যবসায়। স্বামীর ঠিকমতো রোজগার নেই। ভাবলাম, তিনমাস এই ব্যবসা করলে কোনওমতে সংসার চলবে। বিহারের আজিমনগরের বাসিন্দা মুসমদ তালুদেবী। সারাবছর মূলত শামুক বিক্রি করেন। এখন অবশ্য লিচুর ব্যবসা করছেন। এখন প্রতিদিন রাতে ট্রেনে করে কালিয়াগঞ্জ আসেন। ভোরে দুতিন হাজার লিচু কিনে আবার সকালে ট্রেনে চড়ে আজিমনগর পৌঁছান। তাঁর কথায়, আজিমনগরেও স্টেশনের সামনেই বাজার। ট্রেন থেকে নেমে বাজার না ধরতে পারলে লিচু বিক্রি হবে না। বাজার শেষ করে তবেই বাড়ি ফেরা যায়।

বাংলা ও বিহার সীমান্তের কাচনায় বাড়ি স্বাধীন পাল এবং মোকসেদ আলির। দুই বন্ধু মিলে লিচুর ব্যবসা করছেন। সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন কালিয়াগঞ্জে তাঁরা লিচু কিনতে আসেন। এমন খোলামেলা জায়গায় ঘুম আসে না। তাই গল্প করেই দুই বন্ধু মিলে রাত পার করে দেন। জানালেন স্বাধীন।

তিনি বলেন,ভোরের আলো ফুটলেই বাজার থেকে সবচেয়ে ভালো লিচু কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। হাজার লিচুর গোছার বর্তমান দাম ৪০০ টাকা। কাচনায় বিক্রি হয় ৬০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা প্রতি হাজার দরে। করোনা আবহেও তাই চলছে বেঁচে থাকার লড়াই।