খুনের পর ধর্ষণ, সিরিয়াল কিলার ‘চেনম্যান’-কে ফাঁসির সাজা শোনাল আদালত

397

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: সিরিয়াল কিলার ‘স্টোনম্যান’ আতঙ্কে একসময় বুক কাঁপত মুম্বই ও কলকাতাবাসীর। তেমনই এক সিরিয়াল কিলার ‘চেনম্যান’-কে ঘিরে ২০১৯ সালে আতঙ্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল পূর্ব বর্ধমানের কালনায়। গলায় চেন পেঁচিয়ে বাড়িতে একা থাকা মহিলাকে খুন করার পর ধর্ষণ করে লুটপাত চালাত ‘চেনম্যান’।

সেই সিরিয়াল কিলার ‘চেনম্যান’ কামরুজ্জামান সরকারের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিল আদালত। সোমবার পূর্ব বর্ধমানের কালনার অতিরিক্ত জেলা দায়রা আদালতের বিচারক তপনকুমার মণ্ডল এই সাজা ঘোষণা করেন। আদালত দৃষ্টান্তমূলক এই সাজা ঘোষণা করায় খুশি কামরুজ্জামানের হাতে খুন হয়ে যাওয়া কালনার সিঙ্গেরকোনের নাবালিকা ছাত্রীর পরিবার।

- Advertisement -

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালের ৩০ মে বিকালে কালনার সিঙ্গেরকোন গ্রামে নিজের বাড়িতে একাই ছিল দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া নাবালিকা ছাত্রীটি। তার মা তখন অপরের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ সারতে গিয়েছিলেন। এলাকায় রেইকি চালানোর সময়ে ছাত্রীটি বাড়িতে একা থাকার বিষয়ে জানতে পারে কামরুজ্জামান। সুযোগ বুঝে সে চুপিসারে ছাত্রীর ঘরে ঢুকে পড়ে।

অভিযোগ, কামরুজ্জামান প্রথমে ছাত্রীকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়। ছাত্রী বাধা দিলে কামরুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরপরেই কামরুজ্জামান ধারালো ও ভারী কিছু দিয়ে ছাত্রীর মাথায় আঘাত করার পর তার গলায় লোহার চেন পেঁচিয়ে ধরে। ছাত্রী জ্ঞান হারালে কামরুজ্জামান মনে করে ছাত্রীটি মারা গিয়েছে। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকা ছাত্রীর উপর যৌন অত্যাচার চালিয়ে কামরুজ্জামান চম্পট দেয়।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন ছাত্রীর মা। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় মানুষজন ঘটনাস্থলে ছাত্রীকে উদ্ধার করে কালনা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ছাত্রীকে বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ওই ছাত্রী হার মানে।

এই ঘটনা নিয়ে ছাত্রীর পরিবার অভিযোগ জানানোর পরেই নড়েচড়ে বসে কালনা থানার পুলিশ। জেলা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারাও খুনি চেনম্যানের খোঁজে নানা ভাবে চেষ্টা চালানো শুরু করেন। খুনির নাগাল পেতে বিভিন্ন থানায় তথ্য পাঠানো হয়। একই সঙ্গে  চলতে থাকে নাকা চেকিং ও খানা তল্লাশী। ঘটনার কয়েকদিন বাদ ২ জুন নাকা চেকিং চলাকালীন কাঁকুরিয়া গ্রামে বাইক নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় ‘চেনম্যান’ কামরুজাম্মান সরকার।

পুলিশের দাবি, ম্যারাথন জেরায় কামরুজ্জামান ছাত্রীর উপর হামলা ও যৌন নির্যাতন চালানোর কথা কবুল করে। জিজ্ঞাসাবাদে কামরুজ্জামান পুলিশকে জানায়, তার আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদে হলেও স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে সে কালনার সমুদ্রগড়ের সুজননগরে থাকা শুরু করেছে। ৩ জুন ধৃত কামরুজ্জামানকে কালনা আদালতে পেশ করে পুলিশ নিজেদের হেপাজতে নেয়। কামরুজ্জামানকে হেপাজতে নিয়ে পুলিশ তদন্ত চালালে উঠে আসে আরও নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

তদন্তকারী পুলিশ কর্তারা জানতে পারেন সিঙ্গেরকোনের ছাত্রী কামরুজ্জামানের প্রথম শিকার নয়। ওই বছর ৬ মাসের মধ্যে কালনা মহকুমার ৬ মহিলা কামরুজ্জামানের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছে। এছাড়াও হুগলী ও পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায় ঘটানো ১৩টি ঘটনার মধ্যে সে ১১টি খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, বাড়িতে একা থাকা মহিলারাই ছিলেন কামরুজ্জামানের টার্গেট। তার জন্য বাইকে চড়ে নানা অছিলার এলাকায় এলাকায় ঘুরে সে রেইকি চালাত।

এরপর সুযোগ বুঝে বাড়িতে একা থাকা মহিলার ঘরে ঢুকে গিয়ে অতর্কিতে আক্রমন শানাত কামরুজ্জামান। প্রথম সে ধারালো ও ভারী ধরনের লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে মহিলাকে ঘায়েল করত। পরে গলায় চেন পেঁচিয়ে ওই মহিলাকে খুন করে সে তার যৌন লালসা পূরণ করত। এই কার্যসিদ্ধি হবার পর মহিলার ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিয়ে কামরুজ্জামান চম্পট দিত। চুরি করা সামগ্রী বিক্রির টাকায় কেনা দামি পোষাক পড়ে নিত্যনতুন বাইক চড়ে ঘুরে বেড়াত কামরুজ্জামান।

পুলিশ দাবি করেছে, সিঙ্গেরকোনের ছাত্রীকে খুনের ঘটনায় ধরা পড়ার পরেই কামরুজ্জামানের সমস্ত কুকীর্তির পর্দা ফাঁস হয়ে যায়। কালনা আদালতের বিচারক এদিন কামরুজ্জামানের ফাঁসির সাজা ঘোষণার পর নিহত ছাত্রীর মা বলেন, এবার আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। বিচারক এই নিষ্ঠুর খুনিকে যোগ্য সাজাই দিয়েছেন। আদালতের সরকারী আইনজীবী সৌম্যদীপ রাহা বলেন, সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক খুনির এই সাজা ঘোষণা করেছেন। যদিও কামরুজ্জামানের ফাঁসির সাজা মেনে নিতে পারেননি তার স্ত্রী জাহানারা বিবি। অভিযুক্তের আইনজীবী অরিন্দম বাজপেয়ী জানিয়েছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবেন।