ধাত্রীগৃহেই এখন স্মৃতি কামতাপুর আন্দোলন

76

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, কুমারগ্রাম : প্রশ্নটা শুনে এ ওঁর দিকে কিঞ্চিত্ অসহায় চোখে তাকান দুজনে। উত্তর দেন না। ভয়টয় নয়, স্রেফ না জানার জন্য। অনাগ্রহের জন্য। মাঝদুপুরে পাশের বাড়ি থেকে কিশোরীর অপটু গলাসাধার আওয়াজ ভেসে আসছে। সারেগামাপাধানির মাঝে পুখুরিগ্রাম দুর্গাবাড়ির মোড় মোটামুটি ফাঁকা। কিছু দোকান ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে। এক তরুণী বসে বাসের অপেক্ষায়। এই দুই ভদ্রলোক বেঞ্চে বসে লটারির টিকিট বিক্রি করছিলেন। সময়টা প্রশ্নের পক্ষে হয়তো সত্যিই বেমানান। কামতাপুর পিপলস পার্টির কেউ আপনাদের কুমারগ্রাম কেন্দ্রে ভোটে দাঁড়িয়েছে, জানেন? উত্তর আসে, না।

কুমারগ্রাম গঞ্জ এবং কুমারগ্রাম চা বাগানের মাঝখানে জায়গাটা। কেএলও প্রধান, জঙ্গি নেতা জীবন সিংয়ে পৈতৃক ভিটে উত্তর হলদিবাড়ি থেকে সামান্য দূরে। কিন্তু কামতাপুরি পার্টিগুলোর সাম্প্রতিক খবর রাখেন না অধিকাংশ স্থানীয় মানুষ। দিদি-মোদি, পদ্ম-ঘাসের দোলায় বাকি সব আড়ালে চলে গিয়েছে। কামতাপুর পিপলস পার্টিও দুই ভাগ এই মেরুকরণের মাঝে পড়ে।

- Advertisement -

তা যাক, জীবন কিন্তু এখনও চূড়ান্ত রহস্যময়। কখনও খবর আসে, মারা গিয়েছেন কুমারগ্রামের জীবন। কখনও খবর আসে, তিনি মায়ানমারের জঙ্গলে দিব্যি আছেন। রক্তাক্ত মায়ানমারে তিনি কী করে বেঁচেবর্তে আছেন, দেশের আন্দোলনে তাঁর কী ভূমিকা, কেউ জানেন না। শুধু আলোচনা চলে। এমনকি, তাঁর আসল নাম তামির না তিমির, সেটা আজও ধাঁধা। আরেকটা ধাঁধা আছে। কুমারগ্রামেই কামতাপুর পিপলস পার্টি ইউনাইটেড নামে একটা পার্টি প্রার্থী দিয়েছে।

কামতাপুর আন্দোলনের ধাত্রীগৃহ এই কুমারগ্রাম এখন সম্পূর্ণ আলাদা। একটা বড় রাস্তা চলে গিয়েছে জনপদের মাঝখান দিয়ে সামান্য কিছু দোকানপাট। পুলিশ স্টেশন বা ব্যাংকের নামের নীচে কুমারগ্রাম লেখা থাকলেও অনেক জায়গায় আলিপুরদুয়ার স্টাইলে লেখা কুমারগ্রামদুয়ার। কুমারগ্রামদুয়ার নামে একটা বড় স্কুলও নজরে এল। আসল নামটা কুমারগ্রামদুয়ার-ই। ভুটানে যাওয়ার দুয়ার। ব্রিটিশ আমলে এমন অনেক দুয়ার ছিল ডুয়ার্সে।

আলিপুরদুয়ার থেকে জাতীয় সড়ক ধরে অসম যাওয়ার পথে বারবিশা থেকে বাঁদিকে ঘুরে গিয়েছে পিচের নিটোল রাস্তা। সেটা ধরে ১৮ কিলোমিটার এগোলে কুমারগ্রাম। চারপাশ সবুজে সবুজ গ্রাম।      মাঝে মাঝে মহিলাদের দল বেঁধে যেতে দেখা যাচ্ছে। অনেকে বাচ্চার মিড-ডে মিল নিতে যাচ্ছেন। দেখলে বোঝা যাবে না, এই জনপদ একটা সময় কামতাপুরি জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্য ছিল। জীবনের পাশাপাশি দাপিয়ে বেড়াতেন মিলটন বর্মন ওরফে মিহির দাস, টম অধিকারী ওরফে জয়দেব রায়। ভুটান ও অসম সীমানা খুব কাছে। গা-ঢাকা দেওয়া ছিল জলভাত।

ভোটবারোয়ারির কুমারগ্রাম বাজারে এমন দুজনের সঙ্গে দেখা হল, যাঁরা কুখ্যাত জীবন সিংকে ছোটবেলায় দেখেছেন। বিভিন্ন গ্রামের ফুটবল টুর্নামেন্টে নিজের গ্রামের হয়ে জীবন গলা ফাটাতে আসতেন তখন। তিনি তখনও জীবন হননি।

ইতিহাস বলছে, ২০০৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কেএলও জঙ্গিদের দাপট স্তিমিত। গ্রামের প্রবীণরা কেউ কেউ এখনও সেই রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে সংযমী, কেউ অবশ্য অকপটে বলেন। ওই রাস্তায় খুন-জখম-আতঙ্কের স্মৃতি জড়িয়ে বোড়ো জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে বারবিশার ব্যবসাযী নরেশ দাসকে অপহরণের গল্প আজও ঘোরে এখানে। ২০০৬ সালে বেলাকোবা রেলস্টেশনে শিলিগুড়ি-হলদিবাড়ি ট্রেনে বোমা মেরে ১০ যাত্রীকে কেএলওর মেরে ফেলার গল্পও ঘোরে।

কামতাপুরিদের আঁতুড় হওয়ার আগে কুমারগ্রামে প্রথম চারবার বিধায়ক ছিলেন কংগ্রেসের। ৭৭ থেকে টানা নয়বার আরএসপির। গতবার প্রথম জিতেছিলেন তৃণমূলের জেমস কুজুর। সেই আরএসপি আজ কুমারগ্রামে কোথায়? পদ্মফুলেই যত ভোমরা ও মাছি।

বিজেপি অফিসে ভরদুপুরেও ভিড়। আরএসপি অফিসে গিয়ে দেখা গেল, একটা লোকও নেই। জনশূন্য ঘরে নিজে ঢুকে ফ্যান চালিয়ে বসে আরামে-মেজাজে থাকা যায়। পরিচিত নেতারা প্রচারে। কর্মী বলে কেউ নেই। কুমারগ্রামের মানুষের টুকরো টুকরো কথা জানিয়ে দেয়, আরএসপির সেরা সময়ে আসল হাত ছিল সিপিএমের। কামতাপুরিদের সঙ্গে এখানে জমি ধরে রাখার লড়াইটা ছিল বামেদের বড় শরিকেরই।

কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের পুরোনো স্বর্গরাজ্যে পদ্মের হট ফেভারিট আদিবাসী প্রার্থী মনোজকুমার ওরাওঁয়ের ইতিহাস জানলে শিলিগুড়ির শংকর ঘোষের মুখটা প্রথমে ভাসবে। আদর্শবাদ মুছে বাম থেকে অতি ডান হয়ে সমালোচনার মুখে পড়া শংকরের রোল মডেল হতে পারেন মনোজ।

২০১৪ সালে আরএসপির হয়ে উপনির্বাচনে জেতা মনোজ ২০১৬-তেই পদ্মপ্রার্থী হয়ে যান। হারেনও। ভোটময় বাংলায় মানুষ বড় দ্রুত অতীত ভুলে যায়। মনোজের আদর্শচ্যুতির কথা কিন্তু কেউ বলছেন না। বরং কথা হচ্ছে, তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি নিয়ে আদর্শবাদ চলে গিয়েছে আড়ালে।

সম্ভবত আরও একটা কারণ আছে এর। কুমারগ্রামে আরএসপির যাঁর ট্রিপল হ্যাটট্রিক ছিল বিধায়ক হিসাবে, পরবর্তীকালে সাংসদ সেই দশরথ তিরকিও দুবার পালটে ফেলেছেন পার্টি। তৃণমূল হয়ে এখন বিজেপিতে তিনি। লোকে বলছে, প্রবীণ তিরকির থেকে তরুণ ওরাওঁ ভালো। নীতিবোধ আর বেশি জাগছে না দশচক্রে দশরথের ভূত হয়ে যাওয়া দেখে।

কুমারগ্রামে ভাঙা রাস্তা সারানোর কাজ চালানো চলছে ভোটের মুখে। ওই কাজ দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগবে, এখানে একদা বিদ্রোহী কেএলও মুখগুলো কোথায়? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পুনর্বাসন হয়েছে অনেক কেএলও নেতার। অনেকের চাকরি মিলেছে। কিন্তু ওই আন্দোলনের প্রতি সহানুভতিশীল বাকি মানুষগুলো? তাঁরা তো দুম করে উবে যাননি।

কুমারগ্রামের কাছাকাছি পুখুরিগ্রাম, বারবিশা, কামাখ্যাগুড়ি, চ্যাংমারির মতো জায়গায় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে বড় হয়ে উঠছে একটা তথ্য। ঘরের কাছে সংকোশ, রায়ডাক নদীতে পাথর-বালি তোলার কাজে ব্যস্ত মানুষের অধিকাংশ কামতাপুরপন্থী। স্টোন-চিপসায়নের যুগে কাজের জন্য আপাতত তাঁরা ভুলে গিয়েছেন বিদ্রোহ। পেটের খিদে মিটছে তো। কামতাপুর পিপলস পার্টির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বোঝাচ্ছে, এরা আর পাঁচটা পার্টির মতোই। তবু কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারের অনেকে বললেন, সাধারণ কামতাপুরিদের অন্তরের ক্ষোভ আজও স্পষ্ট।

নকশালবাড়ি এলাকায় চা বাগানের রাস্তায় ঘুরলে বোঝা যায়, নকশাল মনোভাবের কথা কেউ আর এখন বলেন না। এতটাই দূরের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে নকশাল আন্দোলন। কেএলও আন্দোলন ২৬-২৭ বছরের পুরোনো। কুমারগ্রামের গ্রামীণ রাস্তাগুলো কিন্তু এই আন্দোলনকে ভোলেনি। আরও একটা ভোটের বাজারে ক্ষমতাসীন গ্রামীণ নেতাদের ওপর তীব্র ক্ষোভে শুধু পদ্মবনে চোখ রাখছে।