মনের ভাব বোঝাতে পারে ক্যাঙারুরাও

সিডনি : ফ্যারাওয়ের চুরুট পড়া আছে? টিনটিনের সেই গল্প, যেখানে সে নিজের মনের ভাব হাতিদের ঠিকমতো বোঝাতে বেশ সমস্যায় পড়েছিল। সেই সমস্যা মেটাতে তার একটি শিঙে বানানো। ওই শিঙেয় কায়দামতো ফুঁ দিতেই কেল্লা ফতে। টিনটিন কী বলতে চায় তা বুঝতে তারপর হাতিদের এতটুকুও সমস্যা হয়নি। ঠিক যদি এমনটাই ক্যাঙারুদের সঙ্গে করা যায়? বিজ্ঞানীরা অবশ্য এজন্য মোটেই টিনটিন স্টাইলে শিঙে বানানোর পরামর্শ দিচ্ছেন না। মানুষের সঙ্গে কথোপকথন-এর জন্য ক্যাঙারুদের মধ্যে একটা সহজাত দক্ষতা রয়েছে। বেশ কয়েকটি ক্যাঙারুর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এর খোঁজ পেয়েছেন। আড়ালে বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে।

কেমন সেই সমীক্ষা? বেশ মজার। তাঁরা একটি বাক্সে ক্যাঙারুদের জন্য খাবার রেখে দিয়েছিলেন। এমন একটি ঘটনা যদি আমাদের সঙ্গে করা হয়? মানে একটি বাক্সে যদি খুশবুদার বিরিয়ানি ভরে আমাদের সামনে রেখে দেওয়া যায়? নিশ্চিতভাবে আমাদের বেশিরভাগই ওই বাক্সের ওপর গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। যেভাবেই হোক ওই বাক্স খুলে বিরিয়ানি সাঁটানোর চেষ্টা চালাব। বিজ্ঞানীরাও তেমনটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু ও হরি! ক্যাঙারুদের পেটে পেটে যে এমন বুদ্ধি তা কে জানত। যিনি বাক্সে খাবার ভরেছিলেন তাঁকে ওই ক্যাঙারুরা দেখেছিল। ক্যাঙারুগুলি সেই বাক্সের কাছে গেল ঠিকই। কিন্তু তারপর য়িনি ওই বাক্সে খাবার ভরেছিলেন তাঁর দিকে সটান তাকিয়ে থাকল। ভাবখানা এমন যেন, বাপু তুমি যদি দয়া করে বাক্সটা খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা কর তাহলে আমরা খাবারগুলি সাঁটানোর সুযোগ পাই। দেখে তো বিজ্ঞানীদের চক্ষু চড়কগাছ। পাশাপাশি, বিজ্ঞানের নতুন একটি দিক খুলে গিয়েছে দেখে তাঁরা দারুণ আনন্দিতও। ক্যাঙারুরা মানুষের সঙ্গে যে যোগাযোগে সক্ষম তার প্রমাণ যে তাঁরা পেয়ে গিয়েছেন।

- Advertisement -

কুকুর, ছাগল বা ঘোড়ার মতো গৃহপালিত পশুরা মানুষের ইশারা বুঝতে পারে। তারা কী চায়, তা মানুষকে বোঝাতে পারে। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই এর প্রমাণ পেয়েছেন। ক্যাঙারুরাও কি এমনটা পারে? এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বহুদিন ধরেই বেশ কৌতূহল ছিল। তা মেটাতেই ইউনিভার্সিটি অফ রোহ্যাম্পটন আর ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি এ নিয়ে গবেষণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অস্ট্রেলিয়ার তিনটি জায়গায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। পরীক্ষার জন্য ১১টি ক্যাঙারুকে বেছে নেওয়া হয়। তারপর সেই বাক্সের মধ্যে খাবার রেখে দেওয়া হয়। ১১টির মধ্যে ১০টি ক্যাঙারুই বাক্সের কাছে গিয়ে তা খোলার কোনও চেষ্টাই করেনি। বরং যিনি বাক্সে খাবার পুরেছিলেন তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখে বাক্স খুলে দেওয়ার করুণ আর্জি। এরপর পরীক্ষার আরও এক পর্বে ফের চমক। ১১টির মধ্যে ৯টি ক্যাঙারুই বাক্সের কাছে গিয়ে একবার বাক্স আরেকবার যিনি বাক্সে খাবার পুরেছিলেন তাঁর দিকে পালা করে তাকাতে থাকে। হাসার ক্ষমতা থাকলে বুঝি বা একটু হাসতও। এক্কেবারে চোখে চোখে কথা হল, মুখে কিছু হল না সিচুয়েন। দেখে বিজ্ঞানীদের আরও একবার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!

এখন সিটি ইউনিভার্সিটি অফ হংকংয়ে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অফ রোহ্যাম্পটন-এর লিড অথার ডঃ অ্যালান ম্যাকএলিগট বলছেন, এই পরীক্ষায় আমরা ক্যাঙারুদের কাছ থেকে যে ব্যবহার দেখতে পেলাম তা আমরা সাধারণত কুকুর বা ছাগল বা ঘোড়ার মতো গৃহপালিত পশুদের মধ্যে দেখে থাকি। এর পিছনে তাদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ দায়ী। অর্থাৎ বাড়িতে পোষার জেরেই এই পশুগুলির মধ্যে এধরনের প্রবণতা গড়ে ওঠে। কুকুর, ছাগল বা ঘোড়ার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে আমরা তাদের কাছ থেকে একই ব্যবহার পেয়েছি। কিন্তু ক্যাঙারুদের ক্ষেত্রেও যে একই ব্যবহার মিলবে তা আমাদের জানা ছিল না। ঘটনাটি আমাদের বেশ অবাক করেছে। আর এই সূত্রেই বিজ্ঞানের একটি নতুন দিক খুলে গেল বলে ম্যাকএলিগট মনে করছেন। তথাকথিত গৃহপালিত পশু হিসাবে যারা স্বীকৃত তাদের বাইরেও অনেকে যে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে সক্ষম, তা এই পরীক্ষায় প্রমাণিত। ঘটনাটি আমাদের খুবই আনন্দ দিয়েছে। আরও কিছু প্রাণীর ওপর আমরা পরীক্ষা চালাতে চাই। আশা করছি, তাদের ক্ষেত্রেও হয়তো এমনই চমকপ্রদ ফলাফল মিলতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির স্কুল অফ লাইফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের তরফে ডঃ আলোকজান্ড্রা গ্রিন বলছেন, গোটা বিশ্ব ক্যাঙারুকে অস্ট্রেলিয়ার আদি বাসিন্দা হিসাবে জানে ঠিকই। পাশাপাশি, নিরীহ প্রাণীর তকমা দিয়ে তাকে সেভাবে পাত্তাও দেয় না। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই পরীক্ষার সুবাদে ক্যাঙারুদের প্রতি বিশ্ববাসীর এতদিনের ধারণাটা একদম বদলে যাবে। ক্যাঙারুদের ওপর এই সমীক্ষা চালাতে অস্ট্রেলিয়ার অস্ট্রেলিয়ান রেপটাইল পার্ক, ওয়াইল্ডলাইফ সিডনি জু আর ক্যাঙারু প্রোটেকশন কোঅপারেটিভকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অফ অ্যানিমাল বিহেভিয়ার (এএসএবি) এই পরীক্ষার জন্য আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিল।