কেরল হাতি-মানুষ সংঘাত রুখলেও বাংলা ব্যর্থ

364

গৌতম সরকার : কেরল এবং পশ্চিমবঙ্গে বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে সমস্যা প্রায় একই। কেরল যদি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ পারবে না কেন? নিদেনপক্ষে দেখেও তো শিক্ষা নিতে পারি আমরা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে হাতি চলাচলের সমস্ত করিডর হয় রুদ্ধ, না হয় জবরদখল হয়ে আছে। সেমিনারে, সভায় বিভিন্ন সময় বনকর্তা বা বিশেষজ্ঞরা ছিন্ন হয়ে যাওয়া করিডর কীভাবে হাতিজীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু করিডর পুনরুদ্ধারে কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। না দক্ষিণবঙ্গে, না উত্তরবঙ্গে। এতে হাতি-মানুষের সংঘাত তো বাড়ছেই, হাতির জিনগত বৈচিত্র‌্যও হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। অথচ যাতায়াতের পথ ফিরিয়ে হাতি সংরক্ষণের ব্যতিক্রমী মডেল তৈরি করেছে কেরল। ওই মডেলে যেমন প্রায় ৬,৫০০ হাতি উপকৃত হয়েছে, তেমনই বাঘ সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব বেড়েছে। এমনকি, মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান শুধু নয়, আয়বৃদ্ধির নতুন পথ খুলে গিয়েছে।

কেরলে এই করিডরটি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধির নির্বাচন কেন্দ্র ওয়েনাডে। থিরুনেল্লি ও কুডরাকোটের মধ্যে বিস্তৃত ওই করিডরটিতে হাতি চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিশ্চিত করতে বন দপ্তরকে পুনরুদ্ধার করতে হয়েছে মাত্র ৩৭ একর জমি। এর ফলে হাতি চলাচলে আর কোনও বিঘ্ন নেই ওই এলাকায়। চোখে পড়েছে বাঘ, হরিণ সহ আরও নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির এই সাফল্যে উৎসাহিত কেরলের বন দপ্তর রাজ্যে হাতির আরও সাতটি করিডরের দিকে নজর দিয়েছে। রাজ্যের চিফ ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন সুরেন্দ্র কুমার বলেন, সাতটি করিডরের মধ্যে দুটি ইতিমধ্যে পুনরুদ্ধার হয়েছে। এছাড়া ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া একটি করিডরের জমি উদ্ধার করে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। আরও চারটি করিডর পুনরুদ্ধারে আমরা কাজ শুরু করেছি।

- Advertisement -

কেরলের এই সাফল্যের পিছনে ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (ডব্লিউটিআই) শুধু নয়, আরও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনও উদ্যোগই কখনও নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর ধরে হাতির করিডর দখল করে চায়ে আবাদ গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও হাতির যাতায়াতের পথেই তৈরি করা হয়েছে শ্রমিক আবাস। হাতি যেহেতু তাদের নিজস্ব পথেই চলতে চায়, সে কারণে ঘুরে-ফিরে হাতির পাল শ্রমিক মহল্লায় হানা দেয়। বাড়ে হাতি-মানুষের সংঘাত। জলপাইগুড়ি জেলায় বিন্নাগুড়ির আস্ত সেনাছাউনিটাই হাতির করিডরের ওপর গড়ে উঠেছে। এখনও মাঝে মাঝে হাতি ঢুকে পড়ে ওই সেনাছাউনিতে।

ডুয়ার্সের রেলপথে একাধিক জায়গায় হাতির করিডর ছিন্ন হয়েছে। পুরোনো পথে চলাফেরা করতে গিয়ে চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয় হাতির দেহ। আলিপুরদুয়ারের হাসিমারার কাছে ভার্নাবাড়ি এলাকায় প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার হাতির করিডর দখল করে গড়ে উঠেছে জনবসতি। ওই পথে হাতির দল একেবারে অসম থেকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প হয়ে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে পৌঁছোয়। একইভাবে তোর্ষা নদী লাগোয়া এলাকায় পাটকাপাড়ায় মাত্র তিন বিঘা জমির জন্য বক্সা বনের সঙ্গে জলদাপাড়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ওটাও হাতির করিডর। আবার স্বাভাবিক গতিপথ ছিন্ন হওয়ায় মাদারিহাটের মধ্য ছেকামারি গ্রামের ভিতর দিয়ে খয়েরবাড়ি বনাঞ্চল পর্যন্ত যাতায়াত করে হাতি। এতে মানুষের প্রাণহানি ঘটে, ফসলের ক্ষতি হয়।

বন দপ্তর সূত্রে খবর, জলপাইগুড়ির বানারহাট এলাকার আপার কলাবস্তিতে গত কয়েক বছর ধরে একপাল হাতি ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। বনকর্তাদের বক্তব্য, করিডর না থাকায় ওই হাতিগুলি দূরে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে না। এতে হাতির জিনগত বৈচিত্র‌্য নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। উত্তরবঙ্গে অসম লাগোয়া সংকোশ থেকে নেপাল সীমান্তের মেচি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত জঙ্গলে হাতির করিডরগুলির অধিকাংশই আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। এইসব করিডরের অনেকগুলি দখল করে গড়ে উঠেছে বসত। সে সব সরাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল রাজনৈতিক বাধা। আটের দশকে আলিপুরদুয়ার জেলায় জয়ন্তীর কাছে ভুটিয়াবস্তিকে একবার সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বটে। কিন্তু সব পরিবারকে সরানো যায়নি এই কারণে।

পশ্চিমবঙ্গের বন দপ্তর না পারলেও কেরল কিন্তু সকলের সহযোগিতায় ১৫ বছরে কাজটি সফল করতে পেরেছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল- করিডর দখল করে গড়ে ওঠা বসতি সরানো। এই ধরনের বসতি উত্তরবঙ্গেও বড় সমস্যা। কেরলে কিন্তু প্রায় ২০০ পরিবারকে ওই করিডর এলাকা থেকে নির্বিঘ্নে সরানো গিয়েছে। ডব্লিউটিআই গত অগাস্টে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তা থেকে জানা যাচ্ছে, ওই বসতিগুলিতে আগে কোনওরকমে কুঁড়েঘরে থাকতেন সেখানকার বাসিন্দারা। তাঁদের সবাইকে পাকা বাড়ি ও কৃষিকাজের জন্য জমি দেওয়া হয়েছে। নতুন বসতিতে রাস্তা, বিদ্যুত্, পানীয় জল ইত্যাদি সমস্ত নাগরিক পরিষেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে কেরল সরকার। ডব্লিউটিআই-এর ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন আর হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘাত নেই। ভিন্ন এলাকায় বসবাসের জন্য প্রাণ বা ফসলহানির বিপদ আর নেই। উপরন্তু আয় বেড়েছে প্রচুর। যাঁরা বছরে ৪০-৪১ হাজার টাকা কোনওরকমে রোজগার করতেন, তাঁদের এখন আয় বার্ষিক ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার বেশি। বাজার কাছে হওয়ায় জমির ফসল বিপণনেও সুবিধা হয়েছে ওই বাসিন্দাদের। স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন কাছে বলে বিনা খরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন তাঁরা। আবার স্কুলও কাছে বলে সাক্ষরতার হার বাড়তে শুরু করেছে। ডব্লিউটিআই-এর রিপোর্ট অনুসারে, ওই এলাকায় নিরক্ষরতার হার ৩৩ থেকে ২৮ শতাংশে নেমে গিয়েছে। ডব্লিউটিআইয়ের করিডর সম্পর্কিত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাসনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, করিডর নষ্ট হলে হাতি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে না। ফলে প্রজনন ও জিন বৈচিত্র‌্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এজন্য হাতির সংখ্যাও কমে যেতে পারত। কেরলের এই প্রকল্প সেই বিপদ ঠেকিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু ঝুঁকিটা থেকেই গেল।