দখলদারিতে আজ নালায় পরিণত খেমচি নদী

179

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : বলে না দিলে খেমচিকে আর নদী বলে মনে হবে না এখন। বেআইনি নির্মাণের গ্রাসে খেমচি এখন নালা মাত্র। নকশালবাড়ি বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীটি কৌলীন্য হারিয়েছে। একসময় দুকূল ছাপিয়ে জল বইত নদীটিতে। এখন সেই নদীর জায়গা দখল করে গজিয়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ নির্মাণ। শুধু খেমচি নয়, নকশালবাড়ির এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় দখলদারির খবর এর আগেও সংবাদপত্রের শিরোনামে উঠে এসেছে বটে। কিন্তু হুঁশ ফেরেনি প্রশাসনের। ফলে নদীর গতিপথ আটকে অবাধে গড়ে উঠছে একের পর এক দোকান, গ্যারাজ, ভবন। নকশালবাড়ি বাজারে নদীর ওপর লোহার শেড দিয়ে তৈরি হয়েছে গ্যারাজ। ভাড়ার বিনিময়ে সেই গ্যারাজে রাখা হচ্ছে ছোট-বড় গাড়ি। কোথাও আবার মাথা তুলেছে দোতলা বাড়ি, দোকানঘর। প্রচণ্ডীপাড়াতেও নদীর ওপর লোহার শেড দিয়ে গ্যারাজ তৈরি হয়েছে। এজন্য প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না কেউ।

দিনদুপুরে এভাবে নদী দখল চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রশাসন এই দখল রুখতে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা নকশালবাড়ি বিডিও অফিসে নালিশ জানিয়েছিলেন বটে। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। উলটে বিডিও অরিন্দম মণ্ডল বলেন, নদী বা নর্দমার ওপর অবৈধ নির্মাণ দেখার দায়িত্ব নয় আমার নয়। আমাদের কাজ প্ল্যানিং পাশ করা। তবে প্রশাসনের কেউ এই দখলদারির সঙ্গে যুক্ত থাকলে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  বিডিওর এই মন্তব্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে এলাকার বাসিন্দা ও পরিবেশপ্রেমীদের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দা গজেন্দ্র মল্লিকের ভাষায়, অনেক জায়গায় নদীর গতিপথ আটকে এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যে বর্ষাকালে খেমচি নদীর জল রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অনেক বাড়িতে জল ঢুকে যায়। নদীর জায়গা দখল করে নির্মাণ চলতে থাকায় এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি অন্যায় মানলেও সেচ দপ্তরেরও যে নজরদারি নেই, তা স্পষ্ট এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সুনীল ঠাকুরের বক্তব্যে। তিনি বলেন, নদীর গতিপথ আটকে নির্মাণকার্য অবশ্যই অবৈধ। তবে নকশালবাড়ির খেমচি নদীতে অবৈধ নির্মাণ নিয়ে এখনও কোনও অভিযোগ পাইনি। তাই আইনত কোনও ব্যবস্থা নিতে পারব না।

- Advertisement -

কেউ বাধা না দেওয়ায় দখলদারদের নজর এখন নদী ছাড়িয়ে সরকারি জমিতেও পড়েছে। এলাকার বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতা এই দখলদারির সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নকশালবাড়ি কারগিলদ্বীপে পঞ্চায়েত সমিতির তৈরি নিকাশিনালা দখল করে বানিয়ে ফেলা হয়েছে আস্ত একটা দোতলা ভবন। বিয়ে সহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে ভবনটি। নকশালবাড়ি পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সহ সভাপতির দোকানের সিঁড়ি তৈরি হয়েছে একেবারে ফুটপাথের ওপরে। এলাকার আরেক প্রভাবশালীর দোকানঘরের ছাদ হাইটেনশন বৈদ্যুতিক তারের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

দখলদারি শুধু নদীতে নয়, পথেও। পুলিশের নাকের ডগায় নকশালবাড়ি থানার সামনে ফুটপাথ দখল করে পাকা দোকানঘর তৈরি হয়েছে। প্রচুর দোকানের শেড এসে পড়েছে রাস্তার ওপর। নকশালবাড়ি ব্লক কংগ্রেস কার্যালয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ের মাঝখানে পূর্ত দপ্তরের ফুটপাথ দখল করে হয়েছে অবৈধ নির্মাণ। কংগ্রেস কার্যালয়ে সীমানাপ্রাচীরটিও তৈরি হয়েছে ফুটপাথ ঘেঁষে। ফলে যানজট তীব্র আকার নেয় এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা রাজেশ বিশ্বাস বলেন, ফুটপাথ দখল হয়ে যাওয়ায় সবসময় যানজট থাকে। দুটি পার্টি অফিস একই লাইনে থাকায় মিটিং-মিছিলে সব সময় কর্মী-সমর্থকদের ভিড় লেগে থাকে। সাপ্তাহিক বাজারের দিনগুলিতে সাধারণ মানুষ ফুটপাথ দিয়ে চলাফেরা করতে ভীষণ সমস্যায় পড়েন।

আরেক বাসিন্দা সুদেব রায়ের কথায়, দুই পার্টি অফিসের সামনে সারাক্ষণ ম্যাক্সি ক্যাব, বাস, টোটো দাঁড়িয়ে থাকে। তাছাড়া ফুটপাথের ওপর পাকা সিঁড়ি, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ হওয়ায় যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা বলেন ঠিকই কিন্তু তাঁদের চোখের সামনে বেআইনি কাজ হতে থাকলেও মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন তাঁরা।