অভাবে পড়েই কিডনি বিক্রি, বলছেন বিন্দোলের বাসিন্দারা

813

রায়গঞ্জ: কিডনি দিতে দিল্লি যাচ্ছেন তিন ব্যক্তি। বুধবার তাঁরা প্লেনের টিকিট বাতিল করে বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রায়গঞ্জ থেকে সড়কপথে বিহারের কিশনগঞ্জ। সেখান থেকে পাটনা। পাটনা থেকে সরাসরি দিল্লি। শুধু তাই নয় সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা যাওয়ারও প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন কিডনি দাতারা। তাঁদের বিমান খরচ থেকে শুরু করে ভিসা খরচ সবকিছুই বহন করবেন প্রভাবশালী এবং শিল্পপতিরা।

কিডনি পাচারের মূল চক্রের পান্ডা আব্দুল কুদ্দুস ও শরিফুল ইসলাম। তাঁদের বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায়। ১৯৮৮ সালে তাঁরা বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হয় কিডনির দালালি। বছর আটেক আগে মৃত্যু হয়েছে শরিফুল ইসলামের। বর্তমান এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন আব্দুল কুদ্দুস। উত্তর দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় তাঁর একটা করে এজেন্ট রয়েছে। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজে ডায়ালিসিস চালু হওয়ার পর থেকেই আব্দুল কুদ্দুসের হাসপাতালে আসা-যাওয়ার শুরু। সেখান থেকেই তথ্য নেওয়া হয় কার কিডনির প্রয়োজন। কত লাখ টাকার বিনিময়ে কিডনি নেবে কিডনি বিকল হওয়া রোগীর পরিবার। আব্দুল কুদ্দুসকে কিডনি পাচারের জন্য একাধিক বার পুলিশের গোয়েন্দা থেকে শুরু করে লালবাজারের সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে। জেলও খেটেছে। তাঁর বিরুদ্ধে রায়গঞ্জ থানা, হেমতাবাদ থানা, হাওড়া ও হুগলি জেলায় কিডনি পাচারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যদিও সব ক্ষেত্রেই শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন তিনি।

- Advertisement -

জেলা পুলিশের গোয়েন্দা থেকে শুরু করে সিআইডি কর্তাদের নজরে রয়েছেন আব্দুল কুদ্দুস। তবে সেই সমস্ত নজর এড়িয়েও কিডনি পাচারে রমরমা ব্যবসা করে চলেছেন আব্দুল কুদ্দুস। যদিও গরিব মানুষের বক্তব্য, ‘বিপদে আব্দুল আমাদের সাথ দেয়। মেয়ের বিয়ে থেকে শুরু করে চিকিৎসা সবক্ষেত্রেই আব্দুল আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অগ্রিম টাকাও দিয়ে দেয়। যখন কিডনি দেওয়ার সময় হয় তখন ঠিক ওর সঙ্গে চলে যাই। তবে আগে পাওয়া যেত দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা এখন পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকা।’

কিডনি কত দরে বিক্রি হয়? মিক্কিমেঘা কোভিড হাসপাতালের প্রাক্তন সুপার তথা কুনোর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাঃ দিলীপকুমার গুপ্তার বক্তব্য, ‘আমি যখন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ছিলাম তখন দেখেছি, কিডনি বিক্রি হয় ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকায়। তবে এখন করোনা আবহে কিডনির রেট বেড়ে গিয়েছে। এখন বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ লক্ষ টাকায়।’

এদিন একটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল বিরল রোগে ভুগছেন ১৮ বছরের এক যুবক। টাকার অভাবে চিকিৎসা ও করাতে পারছেন না। দিনের পর দিন ছেলে মৃত্যুর মুখে ঢোলে পড়ছে। তাই বাধ্য হয়েই ওই পরিবারের সদস্যরা কিডনি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু সময়ের অপেক্ষা। তাঁদের বক্তব্য, ‘ছেলে প্রতিবন্ধী অবস্থায় পড়ে থাকলেও এখনও পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের তরফে কোনও সাহায্য পাইনি। প্রতিবন্ধী কার্ড থাকলেও এখনও ভাতা পাচ্ছে না ছেলে। ছেলেকে বাঁচানোর শেষ উপায় কিডনি বিক্রি।’

একটি গ্রামে কোনও পুরুষের দু’টো কিডনি নেই। অবাস্তব মনে হলেও বাংলাদেশে লাগোয়া উত্তর দিনাজপুরের বিন্দোল গ্রাম পঞ্চায়েতের জালিপাড়া গ্রামে এটাই বাস্তব। অভাবের তাড়নায় মাত্র কয়েক লক্ষ টাকার লোভে তাঁরা কিডনি বিক্রি করছেন। অঙ্গদানের বিষয়টিতে নজরদারির জন্য প্রতিটি ব্লক, পঞ্চায়েত ও মহকুমাস্তরে দুই সদস্যের ভেরিফিকেশন কমিটি গঠন করা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে।

আইন মোতাবেক, অথরাইজেশন কমিটির অনুমোদন ছাড়া নিকটাত্মীয় বা কাছের মানুষকেও অঙ্গদান করা নিষিদ্ধ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত কিডনি বা মানব অঙ্গদানের ক্ষেত্রে হাসপাতাল মারফৎ আবেদন করতে হত স্বাস্থ্য দপ্তরে। আবেদন খতিয়ে দেখে অনুমোদন দিত অথরাইজেশন কমিটি। কিন্তু এই নিয়মের ফাঁক গলে মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিচ্ছে কিডনি পাচারকারীরা। একপ্রকার বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে কিডনি বিক্রি করছেন হতদরিদ্র পরিবারের পুরুষ-মহিলারা।