মায়ানমার ও বাংলাদেশে সদস্য সংগ্রহ, নতুন করে তৈরি হচ্ছে কেএলও

959

জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : মায়ানমারে ঘাঁটি গেড়ে কেএলও চিফ জীবন সিংহ নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি থেকে সদস্য রিক্রুটমেন্টের কাজ শুরু করেছেন। নতুন করে তিনি থাবা বসানোর চেষ্টা করছেন আলিপুরদুয়ার জেলার কুমারগ্রাম সীমান্তেও। চিন থেকে খাদ্য ও রসদ নিয়মিত পৌঁছাচ্ছে মায়ানমারে কেএলও-র জঙ্গি শিবিরে। এই শিবিরে বর্তমানে ১৫০ জন কেএলও জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। জঙ্গিদের কাছে ইউএমজি, এইচকে ৩৩, রকেট লঞ্চার, ৯ এমএম পিস্তল এবং একে ৪৭-এর মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তে রংপুর জেলার গভীর অরণ্যে কেএলওর দ্বিতীয় ক্যাম্প চলছে। কেএলওর জেনারেল সেক্রেটারি কৈলাস কোচ এই ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন। ক্যাম্পের আবাসিকের সংখ্যা ৩০। রাজ্যের গোয়েন্দাদের কাছে এমনই সব চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকও। ইতিমধ্যেই অসম সরকার নীতিগতভাবে কামতাপুর অটোনোমাস কাউন্সিলের দাবি মেনে নিয়েছে। অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলায় এই কাউন্সিল হচ্ছে। এ রাজ্যের পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ধারণা, কাউন্সিল ঘোষণায় কেএলও বাড়তি উদ্যম পেয়েছে।

নেপালে কেএলও জঙ্গিদের পুরোনো ঘাঁটি ছিল ঝাপা জেলায়। সেখানকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নেপাল থেকে কেএলও সদস্য রিক্রুটমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘালয়, নাগাল্যান্ড এবং অসমেও এই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অসমে আলফা, নাগা জঙ্গিগোষ্ঠী সহ অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর ৬০০ জন আত্মসমর্পণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের শক্তি জাহির করবার জন্য আদা-জল খেয়ে লেগেছেন জীবন সিংহ। সংগঠনের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। কেএলও কেন্দ্রীয় কমিটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমকে যুক্তভাবে নিয়ে গঠন করা হয়েছে। মায়ানমারের ক্যাম্পে ঘাঁটি গেড়ে একদিকে চিনের খাদ্যসামগ্রী অপরদিকে আলফা চেয়ারম্যান পরেশ বড়ুয়ার কাছ থেকে চাহিদামতো অস্ত্র পাচ্ছেন জীবন সিংহ। গত ২৮ ডিসেম্বর মায়ানমারে কেএলওর প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়েছে। জীবন সিংহ স্বয়ং ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কেএলওর নতুন প্রচার সচিব হয়েছেন ডাউসা লাঙ্গাম কোচ। প্রচার সচিব হালেই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছেন, কেএলওদের সংগ্রাম বৃথা যাবে না। কেএলওদের রক্ত ঝরেছে অনেক। স্বাধীন কামতাপুর রাষ্ট্রের জন্য তাদের আন্দোলন চলবে। কোচ-রাজবংশীরা তাদের মাটি উদ্ধার করবেই। অসমে রাজবংশী ভোটব্যাংকের কথা মাথায় রেখে সেখানকার রাজ্য সরকার নীতিগতভাবে কামতাপুর অটোনমাস কাউন্সিলের দাবি মেনে নিয়েছে। এই দাবি মানার পরিপ্রেক্ষিতে কেএলও ভীষণ খুশি। তাদের মূল্যায়ন, আন্দোলনের একধাপ জয় হল।

- Advertisement -

অসমকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারতে জঙ্গি কার্যকলাপ কয়েক দশক ধরে দেশের সরকারকে বিব্রত করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভুটান  ও নেপালে ঘাঁটি গেড়ে আলফা, এনএসসিএন, এনডিএফবির মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি বারবার নাশকতামূলক কাজকর্ম চালিয়েছে। অসমের এই জঙ্গি আন্দোলনের ছোঁয়া এসে পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও। মূলত আলফা, এনডিএফবির সক্রিয় সাহায্যে ১৯৯৬ সাল নাগাদ ভুটানের দক্ষিণ সীমান্তে কেএলও তাদের  জঙ্গি শিবির গড়ে তোলে। এই ক্যাম্পগুলো থেকেই একের পর এক ব্যাচে টাইগার, মিল্টনের মতো জঙ্গি ক্যাডার আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার ও জলপাইগুড়িকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। নেপালে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠার পর কেএলও অস্ত্র ও জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০০৩ সালের ৩ অগাস্ট ভুটানের কিনজো এলাকায় আলফার শিবিরে প্রথম আঘাত হানে ভুটান রয়্যাল আর্মি। তার পরদিনই বাবাংয়ে আলফার একটি গোপন আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয় ভুটান আর্মি। ওই বছর ১৫ ডিসেম্বর ভুটান সরকারের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ায় অপারেশন অল ক্লিয়ার শুরু করে রয়্যাল আর্মি। সেই সময়ই শিবিরে থাকা কেএলও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিরা একের পর এক পালিয়ে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করে। সতর্ক ভারতীয় সেনা ও আধা-সামরিক বাহিনীর হাতে সেই সময় কেএলওর বহু জঙ্গি নেতা ও সদস্য ধরা পড়ে।

এরপরই কার্যত কেএলওর কোমর ভেঙে গিয়েছিল। তবু তারা মায়ানমারকে ঘাঁটি করে আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। মায়ানমারের সীমান্তে এনএসসিএন, কেএলওর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলির ঘাঁটি গড়ে ওঠে। কিন্তু ২০১৭ সালে অপারেশন সানরাইজ ১ ও ২ চালায় মায়ানমার ও ভারতীয়  সেনার যৌথবাহিনী। কেএলওর এরপর আর অস্তিত্ব ছিল না বলেই দাবি করেছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কিন্তু তাদের ভুল প্রমাণিত করে আবার নিজেদের মায়ানমার ও বাংলাদেশের রংপুরকে ঘিরে নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করছেন জীবন সিংহ।