চণ্ডীরঝাড়ের বাতাসে ঘুরে বেড়ায় রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কাহিনী

141

প্রণব সূত্রধর, আলিপুরদুয়ার : কোচ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নাকি চাপা পড়ে রয়েছে দেবী চণ্ডীর পদতলে! চাপরেরপাড়-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের শতাব্দীপ্রাচীন চণ্ডীরঝাড় মন্দিরকে ঘিরে এলাকায় লোকমুখে নানা কাহিনী প্রচলিত। দেবী চণ্ডীর প্রতি এলাকার বাসিন্দাদের অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা দেখে অবাক হতে হয়। অথচ কে জানত, দেবী চণ্ডীর পদতলে একটা আস্ত রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কালজানি ও চেকো নদীর পলির তলায় চাপা পড়েছিল! কে জানত, চাপরেরপাড়-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের এই অখ্যাত গ্রামে লুকিয়ে আছে পাঁচশো বছরের আগেকার এক যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের ইতিহাস! আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ শৈলেন দেবনাথের গবেষণায় উঠে এসেছে এই ইতিহাস। তাঁর বইয়ে এ ব্যাপারে বিশদ তথ্য তুলে ধরেছেন তিনি।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা গিয়েছে, এই চণ্ডীরঝাড়ের দেবী চণ্ডীই হলেন রাজা বিশ্ব সিংহের কোচ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার স্মারক। অধ্যাপক শৈলেন দেবনাথ বলেন, কামতাপুর সাম্রাজ্যের শুরু ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে আর সমাপ্তি ঘটে ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে। কামতাপুর উত্তর-পূর্ব ভারতের হিন্দুরাজ্য ছিল। কামতাপুরের প্রথম রাজধানী ছিল চিলাপাতাগড়, তারপর ময়নাগুড়ি, পঞ্চগড়, ভেটাগুড়ি এবং সবশেষে গোসানিমারি। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান হোসেন শা কামতাপুর দখল করে নেন। তারপর তাঁর সেনাবাহিনীর উচ্চ পদাধিকারীদের এক-একটি জায়গার সামরিক বিভাগ পরিচালনা করা ও রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেন। সেই পদাধিকারীদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন তুর্বক খান বা তুর্কা খান। তুর্কা খানের প্রাসাদ ছিল চণ্ডীরঝাড় গ্রামের পূর্ব দিকে, গদাধর নদীর তীরে কালজানি ও চেকো নদীর সংযোগস্থলে। সেখানে উঁচু ঢিবির মতো জায়গা আজও রয়েছে। আর তুর্কা খানের প্রাসাদের এক কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে বর্তমানের এই চণ্ডীমন্দির।

- Advertisement -

এদিকে, চিকনার জমিদার হারিয়া মণ্ডলের পুত্র বিশ্ব সিংহ কামতাপুর সাম্রাজ্য উদ্ধারের দায়িত্ব নিয়ে ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গলে চলে আসেন। তোর্ষা নদীর তীরে মহাকালগুড়ি অঞ্চলে রাজধানী স্থাপন করেন। বিশ্ব সিংহ কামতাপুর সাম্রাজ্য উদ্ধারের জন্য একদিকে কামতাপুরের জমিদারদের সংগঠিত করতে থাকেন, অপরদিকে হোসেন শার সেনাবাহিনীর বড় বড় আধিকারিকদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। বিশ্ব সিংহ চণ্ডীরঝাড় এলাকায় তুর্কা খানের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হন। যুদ্ধে তুর্কা খানের মৃত্যু হয়। বিশ্ব সিংহ সেই ঘাতক তরবারি সামনে রেখে সেখানে চণ্ডীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ব সিংহের হাতেই চণ্ডীমন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে কোচ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। আর ওই চণ্ডীমন্দিরটি আজও কোচ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিহ্ন বহন করে চলেছে।

তবে শোনা যায়, নদীভাঙনের ফলে মন্দির স্থানান্তরিত করে বর্তমান জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়া কয়েক দশক আগে এই মন্দির থেকে আরেকটি চণ্ডীমূর্তি নিয়ে চেকো এলাকায় আরও একটি চণ্ডীমন্দিরের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা নরেন রায়সরকার বলেন, দেবী চণ্ডী খুবই জাগ্রত। আমাদের বাপ-ঠাকুরদারাও এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কোচবিহার রাজ আমলের দেবী চণ্ডীকে আমরা পুজো দিয়ে আসছি। দেবীকে পুজো দিয়ে সব শুভকাজ হয় গ্রামে। দেবী চণ্ডীর মন্দির থেকেই এই গ্রামের নাম হয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। বর্তমানে খোলা মাঠের পূর্ব দিকে দেবীর মন্দির। পাশে বাঁশ গাছের ঝাড়। সাদামাঠা টিনের চালের ঘর দেখে মন্দিরের তুলনায় আশ্রম বলেই বেশি মনে হয়। হয় নিত্যপুজো। তবে আষাঢ় মাসে অম্বুবাচির আগে ও পরে বাৎসরিক পুজো হয়। তখন গ্রামের বাড়ি বাড়ি দেবী চণ্ডীকে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া সারাবছরই ভক্তরা মানত করে পুজো দেন। একসময় বাসন্তীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো ও হরিনাম সংকীর্তন হত। তবে এখন সেসব জৌলুস কমেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা বাদল দেবনাথ বলেন, কোচবিহারের মহারাজার সময় থেকে এখানে দেবী চণ্ডীর পুজো হয়ে আসছে। আগে ১১টি গ্রামের বাসিন্দা একত্র হয়ে এই পুজো করতেন। এখন মাত্র দুটি গ্রাম মিলে এই পুজো হচ্ছে। তবে আজও দেবী চণ্ডীর আশীর্বাদ না নিয়ে নবদম্পতিকে ঘরে তোলে না গ্রামের কোনও পরিবার। বাড়িতে অন্য কোনও পুজো করার আগে দেবী চণ্ডীর পুজো দেওয়া হয়।