বিনা চিকিৎসায় করোনা আক্রান্তের মৃত্যুর অভিযোগ কুমারগঞ্জে

256

সাজাহান আলি, কুমারগঞ্জ: কুমারগঞ্জ ব্লকে করোনা সংক্রামিত হয়ে আরও এক ব্যক্তির মৃত্যু হল। মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসার জন্য মালদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তারঁ মৃত্যু হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। ৫৩ বছর বয়সী পেশায় ব্যবসায়ী ওই ব্যক্তির বাড়ি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সমজিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ফকিরগঞ্জ এলাকায়। গত ২৭ জুলাই বালুরঘাট হাসপাতালে এই ব্যক্তির সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছিল। বুধবার সেই রিপোর্ট করোনা পজিটিভ আসে। এ নিয়ে কুমারগঞ্জ ব্লকে করোনা সংক্রামিত হয়ে মোট ২ জনের মৃত্যু হল। যদিও মৃতের পরিবার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ায় এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হল বলে অভিযোগ তুলেছেন। এদিকে, কুমারগঞ্জে করোনায় দ্বিতীয় মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে।

কুমারগঞ্জের করোনা সংক্রামিত মৃত ব্যক্তি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। তার পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৫ জুলাই জ্বর, সর্দি, কাশি, পেটের সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে আশাকর্মীর পরামর্শে ওই ব্যক্তি প্রথমে কুমারগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে দেখে কিছু ওষুধপত্র লিখে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সেদিন তার সোয়াব সংগ্রহ করা হয়নি। দু’দিন পর তার শ্বাসকষ্ট সহ জ্বর, সর্দি, কাশি, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি বেশি হলে পরিবারের লোকেরা তাকে বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ২৭ জুলাই তার সোয়াব সংগ্রহ করে, কিছু ওষুধপত্র লিখে ছেড়ে দেওয়া হয়, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ। তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর ২৮ জুলাই তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অতঃপর পরিবারের লোকজন তাকে একটি গাড়ি করে চিকিৎসার জন্য মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু মালদা শহরে পৌঁছানোর একটু আগে রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। তারপর তারা মালদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসককে দেখালে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

- Advertisement -

রাতে সেখানেই তার মরদেহ রাখা ছিল। বুধবার মালদা ভিআরডিএল ল্যাব থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ৫২ জনের করোনা সংক্রমণের তালিকা স্বাস্থ্যদপ্তরে আসে তাতে মৃত ব্যক্তির রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। এ নিয়ে কুমারগঞ্জে করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হল দুই এবং জেলায় মোট ৮ জন।

এ বিষয়ে কুমারগঞ্জের বিডিও দেবদত্ত চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি শুনেছি। কুমারগঞ্জের মানুষের মধ্যে করোনা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনের তরফে সর্বত্র মাইক প্রচার করা হচ্ছে। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করার জন্য চিন্তা করছি। প্রায় একই রকম কথা বলেছেন সমজিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান জয়নূর বেওয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা সমজিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মাইক প্রচারের মাধ্যমে মানুষজনকে করোনার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য আবেদন জানাচ্ছি। আগামীকাল থেকে প্রচারের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করা হবে।

কিন্তু কুমারগঞ্জ বা বালুরঘাট জেলা হাসপাতাল উপসর্গ যুক্ত এই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে কোনওরকম চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা এবং মৃত্যু মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন মৃতের পরিবারের লোকজন। এই পরিবারের এতবড় ক্ষতি কে পূরণ করবেন সেই প্রশ্নও উঠছে। কুমারগঞ্জের সিপিএম নেতা ও জেলা পরিষদের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা মোফাজ্জল হোসেন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বালুরঘাট হাসপাতালে যেদিন তার সোয়াব সংগ্রহ করা হয় সেদিন গুরুতর অসুস্থ ও করোনার বিভিন্ন উপসর্গ যুক্ত এই ব্যক্তিকে কেন হাসপাতালে ভর্তি নিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল না? তাহলে হয়ত এই ব্যক্তিকে কার্যত বিনা চিকিৎসায় মরতে হত না। এখন তার অসহায় দুটি শিশু সন্তান ও তার পরিবারকে কে দেখবে?

তিনি মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী টিভিতে বড় বড় কথা বলছেন। অথচ তার রাজ্যে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক মিথ্যা বলে চলেছেন, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। দেখে মনে হচ্ছে, পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভেঙ্গে পড়েছে। ফকিরগঞ্জের নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও আরএসপির জেলা কমিটির নেতা বিশ্বনাথ শীল এই ব্যক্তির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, দুটি শিশু সন্তান নিয়ে পরিবারটি প্রায় পথে বসে যাওয়ার মত অবস্থা। উপসর্গ যুক্ত ও গুরুতর অসুস্থ এই ব্যক্তিকে কেন হাসপাতালে ভর্তি করে নিয়ে চিকিৎসা করা হল না সেই প্রশ্ন অনেকের মত ইনিও তুলেছেন।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরে ( জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিককে ) একাধিকবার ফোন করলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃতের পরিবার মৃতদেহ নিয়ে হাসপাতালেই রয়েছেন। মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেবে কিনা তারা বলতে পারেন নি। মনে করা হচ্ছে, পরিবারের হাতে মৃতদেহ তুলে না দিয়ে স্বাস্থ্যদপ্তরের উদ্যোগেই করোনা সংক্রামিত ওই ব্যক্তির দেহের সৎকার করা হবে।