রাগবি খেলে সুনাম বাড়ালেও চাকরি জোটেনি লছমিদের

সুভাষচন্দ্র বসু, বেলাকোবা : রাগবি খেলার সুবাদে রাজগঞ্জ ব্লকের মান্তাদারি গ্রাম পঞ্চায়েতের সরস্বতীপুর চা বাগানের একটি আলাদা পরিচিতি আছে। এই বাগানের মেয়েরা রাগবিতে রাজ্য তথা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশে মেয়েদের সিনিয়ার রাগবি টিমে এই বাগানের বাসিন্দা নয়জন রয়েছেন। এছাড়া রাজ্যের জুনিয়ার রাগবি টিমে এই বাগানের ১৫ জন রয়েছে। রাগবিতে রাজ্য তথা দেশকে প্রতিনিয়ত সেবা করে চললেও এই মেয়েদের চাকরি নেই। দেশের অন্য রাজ্য তাদের মহিলা রাগবি খেলোয়াড়দের দিকে প্রতিনিয়ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও সরস্বতীপুরের মেযো বরাবরই ব্রাত্য বলে অভিযোগ। গরিবির বাঁধন থেকে মুক্তি পেতে রাগবিকে আঁকড়ে ধরলেও এই সূত্রে পরিবারে একটু স্বাচ্ছন্দ্য অধরা থাকায় বাগানে যথেষ্টই ক্ষোভ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে।

জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কুমার দত্ত বলেন, সরস্বতীপুর চা বাগানের মেয়েরা রাগবি খেলেন বলে জানি। কিন্তু তাঁরা যে রাজ্য তথা দেশের হয়ে খেলে সাফল্য পেয়েছেন তা জানা ছিল না। পাশাপাশি, চাকরি না পেয়ে তাঁরা যে সমস্যায় রয়েছেন তাও জানতাম না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে দেখা করলে অবশ্যই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করব। এ বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে সর্বতোভাবে তিনি সহযোগিতা করবেন বলে জেলা শাসক অভিষেক তিওয়ারি জানান। তাঁরই এলাকার মেয়েরা যে রাগবিতে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন তা বিধায়ক খগেশ্বর রায়েও অজানা। বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, শীঘ্রই সরস্বতীপুর চা বাগানে গিয়ে ওই মেয়েদের সঙ্গে দেখা করব। অন্য খেলায় মহিলাদের জন্য সরকারি চাকরির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যন্ত বাগানের এই রাগবি খেলোয়াড়দেরও সরকারি চাকরি পাওয়া উচিত। কলকাতায় গিয়ে এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলব।

- Advertisement -

রাজ্যে মহিলাদের রাগবি টিমের কোচ কাম ম্যানেজার তথা সরস্বতীপুর চা বাগানের রাগবি টিমের কোচ রোশন খাঁখাঁ জানান, শিলিগুড়ির ডন বসকো স্কুলের তদানীন্তন ফাদার জর্জ ম্যাথিউস-এর অনুপ্রেরণায় জঙ্গল ক্রস নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পোল ওয়ালস সরস্বতীপুর চা বাগানের মেয়েদের রাগবি খেলায় উৎসাহিত করেন। সেই শুরু। তারপর থেকে বাগানের মেয়েদের মধ্যে ক্রমেই এই খেলা জনপ্রিয় হয়েছে। এই সুবাদে বাগানের পরিচিতিও বেড়েছে। এই বাগানের নিরপানিয়া, মারাপুর, গুদাম, ডিভিশন, সিতারামপুর শ্রমিক লাইনের বাসিন্দা ১৮-২২ বছর বয়সি লছমি ওরাওঁ, আশা ওরাওঁ, রিমা ওরাওঁ, রুশমিতা ওরাওঁ, পুনম ওরাওঁ, সুমন ওরাওঁ, স্বপ্না ওরাওঁ, সন্ধ্যা রাই প্রমুখ দেশের হয়ে রাগবিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায় এশিয়ান গেমসে মেয়েদের রাগবিতে ভারত ব্রোঞ্জ পদক পায়। ওই দলে এই বাগানের লছমি, আশা ছিলেন। এর আগে ২০১৮ সালে ফ্রান্সে ইউথ অলিম্পিকস-এর কোয়ালিফায়িং পর্বে এই বাগানের সন্ধ্যা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। কোয়ালিফায়িং পর্বের বাধা টপকাতে না পারলেও সন্ধ্যার খেলা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছিল। এরকম সাফল্যের নজির অনেক। রিমাদের দেখে বাগানের আরও মেয়ে রাগবিতে উৎসাহিত হলেও কোনও চাকরি না মেলায় লছমিদের দুরবস্থা কাটেনি। এই মেয়েদের বাবা-মায়েরা কেউ এই বাগানের শ্রমিক, কেউবা সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করেন। অভাব থাকলেও মেয়েদের রাগবি খেলা যাতে বজায় থাকে সেজন্য জান লড়িয়ে দিতে তাঁদের কেউই অবশ্য এতটুকু পিছপা নন।

রিমা বলেন, প্রচণ্ড অভাব-অনটনের মধ্যেও রাগবি খেলে রাজ্য ও দেশকে সম্মানিত করার চেষ্টা করছি। একটা চাকরি পেলে আমরা এ কাজ আরও ভালোভাবে করতে পারতাম। রোশন বলেন, আমাদের মেয়েরা সাফল্য পাওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী টুইট করে তাঁদের সাফল্য জানিয়েছেন। উনি যদি এই মেয়েদের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তাহলে এই অঞ্চল থেকে আমরা আরও মেয়েকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরতে পারব।