জীবনের গান গাইছেন ঘরে ফেরা যুবতী

91

রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি : এভাবেও ফিরে আসা যায়! নকশালবাড়ির চা বাগান এলাকার যুবতীর জীবনটা ঠিক যেন রূপকথা।
বাগান এলাকা থেকে সুদূর কানপুরে পাচার হওয়া। রোজ খাবার না মিললেও নিয়ম করে মারধরটা জুটত ঠিকই। বহুবার ধর্ষণের মুখে পড়ার উপক্রম হলেও কোনওমতে নিজের সম্ভ্রম বাঁচানো। একটা সময় সমস্ত দিশা হারিয়ে তিনতলার ছাদ থেকে নীচে ঝাঁপ। কোমরের পাশাপাশি শিরদাঁড়ায় মারাত্মক চোট পেয়ে জ্ঞান হারানো। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়া। একটা সময় হাঁটাচলার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছিল। দু পা আস্তে আস্তে চলার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। আর কাউকে যেন তাঁর মতো পরিস্থিতির শিকার না হতে হয় সেজন্য ওই যুবতী আজকাল আর পাঁচজনকে সচেতন করতে ব্যস্ত। সব দেখেশুনে জীবন ব্যস্ত তাঁকে সেলাম ঠুকতে। সবার প্রশংসায় সলজ্জে যুবতী বলছেন, বহু কষ্টে নরক থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। আমার মতো পরিস্থিতি আর কারও হোক তা চাই না।

নকশালবাড়ি চা বাগান এলাকার বাসিন্দা ওই যুবতীর বাবা-মা চা শ্রমিক। চা পাতা তোলার আয়ে সংসার চলে। বাড়িতে আরও ভাই-বোন। বাবা-মায়ের কষ্ট কমাতে যুবতীর কাজের খোঁজ শুরু। যুবতীর বয়স তখন ১৬। কাজ খোঁজার সূত্রেই মাটিগাড়ার বাসিন্দা এক যুবক-যুবতীর সঙ্গে পরিচয়। স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তারা তখনকার ওই কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ওই যুবক-যুবতী মেয়েটিকে দিল্লিতে একটি বাড়িতে কাজের সুযোগ করে দেবে বলে জানায়। সব জানালেও বাবা-মায়ের আপত্তি। মেয়েটি কথা শোনেনি। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে এজেন্টদের সঙ্গে মেয়েটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে।

- Advertisement -

প্রথমে দুদিন মাটিগাড়ায় এজেন্টদের আস্তানায় ঠাঁই। তারপর দিল্লি। এ পর্যন্ত সব ঠিক থাকলেও তালটা কাটে তারপরই। দিল্লিতে পৌঁছে হাতবদল হয়ে অন্য এজেন্টের মাধ্যমে কানপুরে পাড়ি। সেখানে একটি বাড়িতে কাজ শুরু। দুদিন যেতে না যেতেই পৃথিবীটার বদলে যাওয়া। সময়মতো খাবার জুটত না। মারধরটা জুটত ঠিকই। বাড়ির মালিক একাধিকবার ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত মেয়েটি এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। শেষমেশ নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে কানপুরের সেই বাড়ির তিনতলার ছাদ থেকে নীচে ঝাঁপ। স্পাইনাল কর্ডে মারাত্মক চোট। স্থানীয় এক বাসিন্দার সহযোগিতায় কানপুরের এক হাসপাতালে ভর্তি। মেয়েটির মা দাগাপুরে লিগ্যাল এইড ক্লিনিকের দ্বারস্থ হন। এই সূত্রে পুলিশে অভিযোগ দায়ের। এজেন্টরা মেয়েটিকে কানপুর থেকে নিয়ে এসে মাটিগাড়ার শিবমন্দিরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায়। পরে তদন্ত চালিয়ে পুলিশ ওই এজেন্টদের গ্রেপ্তার করে। কিছুটা সুস্থ ওই যুবতী বর্তমানে নিজের ও আশপাশের এলাকাগুলিতে জোরকদমে সচেতনতামূলক কাজকর্ম চালাচ্ছেন। লিগ্যাল এইড ফোরামের সম্পাদক অমিত সরকার বলছেন, ওই যুবতী অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।