তিস্তার চরে শিল্প ঘোষণায় জমির দালালদের পোয়াবারো

85

গৌতম সরকার, মেখলিগঞ্জ : জয়ী সেতু সংলগ্ন তিস্তার চর এলাকায় নারায়ণী ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর এবং বৃহত্ শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ার বিষয়ে প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। আর এতেই জমি মাফিয়াদের একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে মেখলিগঞ্জ ব্লকের নিজতরফ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছেন, জয়ী সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এখানে জমির দর বাড়তে শুরু করেছিল। প্রকল্প ঘোষণার পর সরকারি জমি দখল এবং দখল করা জমি বেশি দামে বিক্রি করার ব্যবসা বাড়ছে। জমির চাহিদাও এই এলাকায় অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। গোটা কারবারে প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক মদত থাকায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারা এ ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও ভয়ে মুখ খোলেন না।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বছর দুয়েক আগেও নদীর চর এলাকায় জমি কেনার জন্য কেউ আসতেন না। জয়ী সেতুর কাজ শুরু হবার পর জমির একটু চাহিদা বাড়ে। সেই সময়ে প্রতি বিঘা জমি ৬০-৭০ হাজার টাকায় মিলত। কিন্তু বৃহৎ শিল্প ও লজিস্টিক হাব ঘোষণার পরই জমির দাম একলাফে কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। এখন প্রস্তাবিত বড় রাস্তার পাশে জমি কেউ ৪-৫ লক্ষ টাকা বিঘার কম ছাড়তে চাইছে না। এই কারবারে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা অনেকেই জড়িয়েছে। তাঁরা এলাকার পরিচিত মুখ হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই।

- Advertisement -

নিজতরফ গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সুনীল রায় বলেন, এলাকায় জমি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানারকম অভিযোগ উঠে আসছে। বিষয়টি প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী পরেশচন্দ্র অধিকারী বলেন, এনিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছি। এই ধরনের ঘটনা কখনওই বরদাস্ত করা হবে না। মেখলিগঞ্জ ব্লকের ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক সুজন রায় বলেন, আমার কাছে এনিয়ে এখনও কোনও অভিযোগ আসেনি। মেখলিগঞ্জের মহকুমা শাসক রামকুমার তামাং অবশ্য জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেখলিগঞ্জ-হলদিবাড়ি সরাসরি যোগাযোগের জন্য তিস্তার উপর জয়ী সেতু চালু হওয়ার পর থেকে বাইরে থেকে অনেকেই আসছেন এলাকায় জমি কিনতে। তাঁদের আনাগোনার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় নদীর চর ও খাসজমি দখলের ঘটনাও বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে সেই দখল করা জমির অনেকগুলি বিক্রিও হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গ্রামের অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, জয়ী সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফাঁকা খাস জমিতে, চর এলাকার মধ্যেও রাতারাতি ঘর উঠতে শুরু করে। সরকারি জমি দখলের এই কারবারে জমি মাফিয়াদের পিছনে প্রশাসনের একাংশের মদত রয়েছে। না হলে এভাবে অবাধে জমি কেনাবেচার অবৈধ কারবার চলতে পারে না। এলাকার বাসিন্দা মজেন বর্মন, ফরিদ হক প্রমুখ বলেন, জমি কেনাবেচা এখন দালালদের হাতে। ৫০ হাজার টাকার জমি ৫ লক্ষ টাকা দর চাইছে।

তিস্তা নদীতে জয়ী সেতু তৈরি হওয়ার কারণে মেখলিগঞ্জ মহকুমার দুটি ব্লক হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগের অনেক সুবিধা হয়েছে। দুই ব্লকের মধ্যে সরাসরি দূরত্ব মাত্র দশ কিমির মতো হলেও এতদিন অবধি দুই ব্লকের মানুষকে প্রায় ৭০ কিমি ঘুরপথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হত। একদিকে সেতু অপরদিকে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গড়ার পরিকল্পনার পর তাই সেতু সংলগ্ন দু-পারের জমির চাহিদা হুহু করে বাড়ছে। মেখলিগঞ্জের দিকে নিজতরফ আর হলদিবাড়ির দিকে পারমেখলিগঞ্জ এলাকার জমির চাহিদা সবথেকে বেশি। স্থানীয় জমির দালালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে যেখানে বড় রাস্তা হবে তার পাশের জমির দর বেশি। মোটামুটি বিঘাপ্রতি ৪-৫ লক্ষ টাকা দাম পড়ছে। কাগজপত্রও তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন জমির কারবারিরা। তাঁদের কেউ কেউ আরও বলছেন, এরপর জমির দর আরও বাড়বে। শুধু সরকারি প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষা। অনেকে এখন তাই দখল করা জমি ধরে রাখছেন, বিক্রি করছেন না আরও দাম পাওয়ার আশায়।