ফরাক্কা সহ অন্য বাঁধের জন্য জমি দিয়ে মিলছে না চাকরি

573

তনয় মিশ্র, মোথাবাড়ি : ফরাক্কা ব্যারেজ সহ একাধিক বাঁধের জন্য জমি দিয়ে কালিয়াচক এলাকার অনেকেই এখন ভিটেহারা। জুটছে না সরকারি চাকরি। দিদিকে বলো কর্মসূচিতে জানিয়ে কোনও ফল না পেয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে জমিহারারা। অথচ এসব জমি হারানো মানুষকে রাজ্য সরকারের পক্ষে ল্যান্ড লুজার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল। সেই সার্টিফিকেট অনুযায়ী পরবর্তীতে পরিবারের তরফে সরকারের কাছে নিয়ম মেনে চাকরির আবেদন করা হয়। সরকার তাদের চাকরির কার্ডও দেয়। কিন্তু আজও ওই ভূমিহারাদের চাকরি মেলেনি। চাকরির দাবিতে তাঁরা ফের মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন। চাকরির দাবিতে গঠিত হয়েছে মালদা জেলা ল্যান্ড লুজার (ই.সি) উন্নয়ন সমিতি।  রাজ্য সরকারের ১০০ পয়েন্ট রোস্টারে উল্লেখ থাকা ইসি সংরক্ষণ বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে চলছে এই সমিতি।

গঙ্গায় ফরাক্কা ব্যারেজ ও বাঁধ তৈরির জন্য কালিয়াচক এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ জমি ছাড়তে বাধ্য হন। সরকারের তরফে তাঁদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। সেই সময় রাজ্য সরকার সার্কুলার জারি করে বলেছিল, যারা ফরাক্কা বাঁধের জন্য জমি হারাবে বা যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তাদের পরিবারের একজনকে অন্তত চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষ বাঁধ নির্মাণের জন্য জমি দিলেও এখনও তাদের পরিবারের সদস্যদের চাকরি হয়নি। কবে তাদের চাকরি জুটবে তাও কারোর জানা নেই। অথচ এসব জমি হারানো মানুষদের রাজ্য সরকারের তরফে ল্যান্ড লুজার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ করেনি সেই সার্টিফিকেট। বিধায়ক থেকে শুরু করে তাবড় নেতাদের দুয়ারে ঘুরেও চাকরি না মেলায় জমিহারা এই মানুষজন এখন জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত।

- Advertisement -

এমনই এক পরিবারের সদস্য আলি হোসেন মালদা জেলা ল্যান্ড লুজার (ই.সি) উন্নয়ন সমিতির হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। যখন ফরাক্কা বাঁধের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়, আন্দোলনকারীদের অনেকেই অবশ্য সেই সময় জন্মাননি। কিন্তু তাঁরা এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। যদি সরকার নিজেদের জারি করা সার্কুলার বাস্তবায়ন করে চাকরি দেয়। ফরাক্কা বাঁধ লাগোয়া কালিয়াচক থানা এলাকার তোফি গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ আলি হোসেন। তাঁর বাবা গাজিরুদ্দিন শেখের বিঘা তিনেক জমি সম্বল ছিল। ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি জন্য গাজিরুদ্দিন শেখের জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। কিন্তু জমিদাতা তখন জানতেন না, ল্যান্ড লুজার পরিবারের কাউকে সরকারি চাকরি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে আলি হোসেনই একমাত্র বিএ পাশ করেছেন। বর্তমানে ভমিহীন গাজিরুদ্দিনের পরিবার। একইভাবে ১৯৭৮ সালের গঙ্গার বাঁধ তৈরিতে জমি যায় চাঁদমনি খাতুনের। ১৯৮০ সালে জমি যায় শামাইন শেখের। আজ পর্যন্ত তাঁদের পরিবারের কেউ ল্যান্ড লুজার সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাননি।

আলি হোসেন ২০১৫ সালে বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হন। তার নাম এমপ্লয়মেন্ট একচেঞ্জে  এক্সামটেড ক্যাটেগরিতে নাম নথিভুক্ত করেন ল্যান্ড লুজারদের চাকরি দেওয়ার নিয়মের ভিত্তিতে। তারপর সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন করেন রাজ্য সরকারের কাছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতে তত্কালীন মালদা জেলার অতিরিক্ত জেলা শাসক ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে চাকরির জন্য সুপারিশ করেন কলকাতার ৬৭ নং বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে ডেপুটি ডিরেক্টর অফ এমপ্লয়মেন্টের কাছে। এই মর্মে ২০১৫ সালের ২৬ আগস্ট আলি হোসেনকে দেওয়া সার্টিফিকেটে মালদার অতিরিক্ত জেলা শাসক ২০১৪ সালের পনেরোই সেপ্টেম্বর তারিখের ৬১৪/এলএ অফিস মেমো অনুযায়ী আলি হোসেনকে ল্যান্ড লুজার পরিবারের সদস্য হিসেবে চাকরি দেওয়ার জন্য ৬৭ নং বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে ডেপুটি ডিরেক্টর অফ এমপ্লয়মেন্টের কাছে ফরওয়ার্ড করা হয়।

এরপর বহুবার মালদা জেলা শাসক থেকে শুরু করে মোথাবাড়ির বিধায়কের কাছে সরকারি নিয়মের ভিত্তিতে তাঁর চাকরি দেওয়ার দাবি জানালেও কোনও কাজ হয়নি। যদিও, আলি হোসেনের নেতৃত্বে গড়া মালদহ জেলা ল্যান্ড লুজার (ই.সি) উন্নয়ন সমিতি দাবি জানিয়ে এসেছে, অবিলম্বে সরকারি রোস্টার মেনে ল্যান্ড লুজারদের চাকরি দেওয়া হোক। যারা ল্যান্ড লুজার হিসেবে চাকরি পেয়েছেন তাদের তালিকা প্রকাশ করা হোক। যতদিন না বাকি ল্যান্ড লুজারতে চাকরি হয় ততদিন যেন মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হোক ইত্যাদি। ২০১৮ সালে সেই দাবি সংবলিত কপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী ও রাজ্যপালের কাছে পাঠান। তাতেও কোনও কাজ হয়নি।

আলি হোসেন জানান, ল্যান্ড লুজার হিসাবে চাকরির দাবি জানিয়ে আসছি ২০১৫ সাল থেকে। বছরখানেক আগে বাবার মৃত্যু হয়েছে। সংসার চালাতে দুই দাদা রবিউল শেখ ও বিশরদি শেখকে ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে যেতে হয়। যদি সরকারি চাকরি মিলত, তাহলে তাঁদের ভিনরাজ্যে যেতে হত না। সরকারি তরফে কোনও সাড়া না পেয়ে গত বছর মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে দিদিকে বলোতে ফোন করি। পরে সেখান থেকে জানানো হয়, সরকারি প্রতিনিধি বিষয়টির সুরাহা করার জন্য আমার বাড়িতে আসবেন। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও কেউ বাড়িতে আসেননি। আশা করছি, ৫ নভেম্বর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় মুখ্যমন্ত্রীর তরফে এনিয়ে কিছু ব্যবস্থা হবে। বিষয়টি নিয়ে কালিয়াচক ২-এর বিডিও সঞ্জয় ঘিসিং বলেন, সরকারি নিয়ম মেনে এই জেলায় বহু ল্যান্ড লুজারকে রাজ্য সরকার চাকরি দিয়েছে। এখনও যাদের সেই চাকরি হয়নি, যোগ্যতা অনুযায়ী তারা ভবিষ্যতে অবশ্যই সুযোগ পাবে। অল ইন্ডিয়া লিগ্যাল এইড ফোরামের ইস্টার্ন জোনের নবনিযুক্ত কনভেনর অধ্যাপক নাসির আহমেদ (ভাস্কর) বলেন, বাম আমলে দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে উদ্যোগে মালদা জেলার বহু জমিহারা ইতিমধ্যেই সরকারি চাকরি পেয়েছে। এখনও যেসব জমিহারা চাকরি পায়নি, তারা যেন দিদির ওপর আস্থা রাখে। আগামীতে আইন অনুযায়ী তারা এই সুযোগ পেতে পারে। প্রয়োজনে এসব জমিহারাদের লিগাল এইডের তরফে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।