মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া : ডানকানস টি কোম্পানি পরিচালিত বীরপাড়া চা বাগান অচল হয়ে থাকার সুযোগে বাগানের অরক্ষিত জমি দখল করে বিক্রির একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাস্তার পাশে ওই চা বাগানের জমি দখল করে লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ চা শ্রমিক-কর্মচারীদের একাধিক সংগঠনের। দুতিনদিন আগেও বীরপাড়ার দেবীগড় ঘেঁষা ওই চা বাগানের জমির একটি বিরাট অংশ দখল করে বাঁশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। চা শ্রমিক-কর্মচারীদের সংগঠনগুলি জানিয়েছে, বীরপাড়া চা বাগানেরই কয়েকজন দাপুটে লোক ওই বেআইনি কাজ পরিচালনা করছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মাদারিহাটের বিধায়ক মনোজ টিগ্গা। তিনি বলেন, বাগানের জমি এভাবে বিক্রি করে দেওয়া হলে ফল খুব খারাপ হবে। আজ না হোক কাল বাগান খুলবেই। তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। এদিকে, বীরপাড়া চা বাগানে বিজেপির শক্তপোক্ত সংগঠন থাকায় দখলের কারবারে বিজেপির লোকজন জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল।

২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে বীরপাড়া চা বাগান অচল হওয়ার পর ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে খোলে। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস থেকে ফের বাগান অচল হয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এর আগে যখন বাগান অচল হয়ে পড়েছিল, সেই সময় ওই চা বাগানের জমি দখল করে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছিল। অক্টোবর মাস থেকে বাগান অচল হওয়ার পর থেকে ফের জমি দখল করে বিক্রির চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেবীগড়ের পশ্চিম প্রান্তে চা বাগান ও জনবসতি এলাকার বিভাজক হিসেবে রয়েছে পাকা সীমানাপ্রাচীর। নানা কারণে সীমানাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে। এই সুযোগে সীমানাপ্রাচীরের গায়ে চা বাগানের ঝোপঝাড় সাফাই করে বাঁশ দিয়ে ঘিরে ছোটো ছোটো প্লট তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৫ সালে অচল হওয়ার পর চা বাগানের বিভিন্ন অংশের গাছ অযত্নে মরে য়ায়। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে বাগানটি খুললেও সেটি ধুঁকে ধুঁকে চলছিল। ফলে ওই সময় থেকেই চা বাগানটির বিভিন্ন জায়গার জমি পতিত হয়ে রয়েছে। সেই জায়গাগুলিকেই টার্গেট করেছে জমি দখল করে বিক্রির চক্রটি।

স্থানীয় সূত্রের খবর, সাধারণত বাইরে থেকে আসা লোকজন বাড়ি, দোকান তৈরি করার জন্য এ ধরনের জমি কিনে থাকেন। অথচ এ ধরনের কেনাবেচার কোনো বৈধ কাগজপত্র থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই মোটা টাকা খরচ করেও জমির ওপর ক্রেতার কোনো আইনি অধিকার থাকে না। চা বাগানের দখল করা জমি কিনে পরে উচ্ছেদ হতে হয়েছে, বীরপাড়ায় এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। চা বাগান তৃণমূল কংগ্রেস মজদুর ইউনিয়নের সহসভাপতি মান্নালাল জৈন বলেন, গ্যারগান্ডা নদীর কাছে ৩১সি জাতীয় সড়কের পাশে বীরপাড়া চা বাগানের দখল করা জমি আট লক্ষ টাকায় কিনে পাকা ঘর তৈরি করেছিলেন এক ব্যক্তি। কিছুদিন আগে পুলিশ প্রশাসন জায়গাটি দখলমুক্ত করে অবৈধভাবে তৈরি করা ঘরটি ভেঙে দেয়। মানুষ সব জেনেবুঝেও এভাবে জমি কিনে প্রতারিত হলে কারও কিছু করার থাকে না। দেবীগড় ছাড়াও বাস টার্মিনাস সংলগ্ন এলাকায় জাতীয় সড়কের পাশে বীরপাড়া চা বাগানের অনেকখানি জমি দখল করে বিক্রির জন্য বাঁশ দিয়ে ঘিরে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া, জাতীয় সড়কের পাশে পাওয়ার হাউস এলাকায় চা বাগানের জমির বেশ কিছু অংশ দখল হয়ে গিয়েছে। মান্নালাল জৈন আরও বলেন, বীরপাড়া চা বাগানে দীর্ঘদিন ধরেই এই চক্রটি  সক্রিয়। আগে ওরা সিপিএম করত। এখন বিজেপিতে নাম লিখিয়েছে। অভিযোগ উড়িয়ে মাদারিহাটের বিজেপি বিধায়ক মনোজ টিগ্গা বলেন, বীরপাড়া চা বাগানে আমাদের ভালো সংগঠন রয়েছে। তবে জমি দখলের কারবারে আমাদের দলের লোকজনের জড়িত থাকার অভিযোগ একেবারেই ঠিক নয়। এ ধরনের লোকজনদের প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই নেই। সমাজবিরোধীরা কোনো দলের হয় না। তবুও বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে।

ডুয়ার্স চা বাগান ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি গোপাল প্রধান বলেন, বীরপাড়া চা বাগানের জমি দখল বন্ধ করতে প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। মাদারিহাটের বিডিও শ্যারণ তামাং বলেন, বিষয়টি ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরকে জানানো হয়েে। ওই দপ্তরের তদন্তের পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।