ফেলুদার শেষ কাহিনীর রহস্যটা রয়ে গেল

616

 

ফেলুদার শেষ কাহিনীর রহস্যটা রয়ে গেল| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal India

- Advertisement -

সন্দীপ রায়

বাবা তাঁর ফেলু গোয়েন্দাকে নিজের চরিত্র এবং স্বভাবেরও অনেক কিছু উপহার দিয়েছেন। আমরা দেখেছি, ফেলুদার মাথাটা অত্যন্ত ঠান্ডা। সহজে ঘাবড়ায় না, বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে মগজাস্ত্র-র ধার ভোঁতা হয় না। চট করে রাগে না। বাবার মধ্যেও এই গুণটা ভীষণভাবে ছিল। অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজের মানুষ তো বটেই, ওঁকে সেভাবে কোনওদিন রাগতেও দেখিনি। আমাকে একবার বলেছিলেন, শান্তিনিকেতনে থাকার সময় শিল্পী নন্দলাল বসুর মানসিক স্থৈর্য্য নাকি ওঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। নন্দলাল বসুর ড্রয়িংয়ের ভীষণ ভক্ত ছিলেন বাবা। প্রথম জীবনে বাবা ওরিয়েন্টাল আর্টের রীতি মেনে যে সব ছবি এঁকেছেন, তাতে নন্দলাল বসুর শৈলীর প্রভাব রয়েছে। তবে এই নান্দনিক দিক ছাড়াও স্রেফ একজন মানুষ হিসেবে যে নন্দলাল বসু বাবাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, সেটা ভাবতেই আমার ভীষণ ইন্টারেস্টিং লাগে।

বাবার পড়াশোনার পরিধি নিয়ে তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই। ব্ল্যাক ম্যাজিক থেকে বিগ ব্যাং, পড়াশোনার বিষয়ে বৈচিত্র‌্য যে ঠিক কতটা ছিল সেটা ওঁর ঘরে একবার ঢুকলেই এখনও বোঝা যায়। দেশি- বিদেশি পত্রপত্রিকা প্রচুর পড়তেন।

বাবার মতো এতটা না হলেও, ফেলুর পড়াশোনার রেঞ্জও নেহাত কম নয়। এই পত্রিকাগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ফেলুদাও পড়ে। ফেলুদাকে বিশেষভাবে টানে ভ্রমণকাহিনী। কোনও জায়গায় তদন্তে যাওয়ার আগে সেখানকার সম্বন্ধে ভালো করে পড়াশোনা করে নেওয়াটা হল ফেলুদার বরাবরের অভ্যেস। আসলে বাবাও ঠিক এটাই করতেন। সোনার কেল্লা বা জয় বাবা ফেলুনাথে রাজস্থান ও বেনারসের এমন অদ্ভুত বর্ণনা উঠে এসেছে, যে স্রেফ ওই দুটো বই হাতে নিয়ে বোধহয় ওই জায়গাগুলো ঘুরে আসা যায়। জেনে ফেলা যায় তাঁদের ইতিবৃত্ত। কোনও জায়গায় ভূগোল, ইতিহাসের কথা বাবা গল্প বলার ফাঁকে এমনভাবে বলতেন, মনেই হত না কেউ কোনও শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

আসলে পাঠকদেরও বাবা তাঁর চিন্তাভাবনার শরিক করতেন চাইতেন। কল্পবিজ্ঞান লেখক মাইকেল ক্রিকটনের লেখা জুরাসিক পার্ক উপন্যাসটা থেকে ছবি করেছিলেন স্পিলবার্গ। এর আগে ক্রিকটন দুর্দান্ত একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, কঙ্গো। সেটা পড়ে বাবার খুব ভালো লেগেছিল। এরপরেই তিনি শঙ্কুর অভিয়ান কঙ্গোতে নিয়ে গিয়ে ফেললেন, শঙ্কুর কঙ্গো অভিযান।

দেশ-বিদেশের যে সমস্ত জায়গা থেকে বাবা সশরীরে ঘুরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকগুলোই ফেলুদার কাহিনীর পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার ঘটছে সেই সমস্ত জায়গায়, য়েখানে ওঁর যাওয়ার ইচ্ছা ছিল খুবই, কিন্তু সে ইচ্ছা আর বাস্তবায়িত হয়নি। শঙ্কুর কাহিনীগুলোয় ফ্যান্টাসির প্রভাব বেশি বলেই হয়তো তার ঘটনাস্থল নিয়ে পুরোপুরি কল্পনার ওপরেই ভরসা রাখতেন। ক্রিকটনের উপন্যাস পড়ে তো কঙ্গো নিয়ে খুবই উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন বাবা। অন্যদিকে লখনউ, দার্জিলিং, বেনারস, লন্ডন ছিল ওঁর অত্যন্ত পছন্দের জায়গা। ফেলুদার প্রথম দিককার তদন্তগুলো এইসব জায়গাতেই।

ফেলুদার কাহিনীগুলো লেখার সময় তাই কোনও জায়গার রেফারেন্স নিয়ে ওঁকে তেমন সমস্যায় পড়তে দেখিনি। যেটা খুবই হত শঙ্কুকে নিয়ে লেখার সময়। তখনও ইন্টারনেট আসেনি, সামান্য তথ্য খোঁজার জন্যও প্রচুর পড়াশোনা করতে হত। সব সময় বইপত্র হাতের কাছে থাকত না। তবু এতটা পরিশ্রমের জন্যই শঙ্কুর কাহিনীতে ওঁর না দেখা জায়গার বিবরণ এত জীবন্ত; মানুষজন, রাস্তাঘাটের নাম বা ভৌগোলিক বর্ণনাও একেবারে যথাযথ। সিনেমা হোক বা সাহিত্য, ডিটেইল নিয়ে ওঁর চিন্তাভাবনা সত্যিই ছিল দেখে শেখার মতো।

এখানেই শেষ নয়। শঙ্কুর কাহিনীর ইলাস্ট্রেশন করতেও ওঁকে এই রেফারেন্সের সমস্যায় পড়তে হত। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, নেচার ইত্যাদি পত্রিকাগুলো থেকে কিছুটা সাহায্য মিলত ঠিকই, কিন্তু তাতে পুরো প্রয়োজন মিটত না। একটা জায়গার বিবরণ বইয়ে পড়লেও তার হুবহু চেহারাটা বুঝতে কিন্তু সবচেয়ে আগে দরকার ছবি, যেটা সবসময় হাতের কাছে থাকত না। তবে বিদেশে ওঁর প্রচুর বন্ধুবান্ধব ছিলেন। তাঁদের অনুরোধ করতেন কোনও বিশেষ জায়গার ছবি বা পিকচার পোস্টকার্ড পাঠানোর জন্য। সে সব যখন ডাক মারফত হাতে এসে পড়ত, একেবারে ছোট ছেলের মতো আনন্দ করতে দেখেছি ওঁকে। ওই ছবিগুলোকে রেফারেন্স মেনে এরপর ঝটপট ইলাস্ট্রেশনের কাজ সেরে ফেলতেন।

ডিটেইল নিয়ে এত চিন্তাভাবনা করতেন বলেই টিনটিনের কমিকস এত প্রিয় ছিল বাবার। টিনটিনের স্রষ্টা হার্জের সহজ সরল আঁকার ভঙ্গিতে বিভিন্ন দেশ বা শহরের ছবি হুবহু উঠে এসেছে। হার্জের ইলাস্ট্রেশনের ভক্ত ছিলেন বাবা। প্রথম দিকে তো এই ফরাসি কমিকসের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। পরে, ছয়ের দশকের শেষের দিকেই হবে বোধহয়, দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গিয়ে একটা বইয়ে দোকানে হঠাৎই টিনটিনের ইংরেজি অনুবাদ আবিষ্কার করে ফেলি। হার্ড কভার এডিশন, স্পাইনে লাল কভার দেওয়া। বোধহয় চার-পাঁচ টাকা দাম ছিল। সেটা নিয়ে যখন হোটেলে ফিরলাম, বইটা দেখামাত্র উনি আমার হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে গোগ্রাসে পড়ে ফেললেন। টিনটিনের পরের বইগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ আমার আগেই বাবা পড়ে নিয়েছেন। ফেলুদাও কিন্তু টিনটিনের কমিকসের ভীষণ ভক্ত।

আমার ধারণা, এতটা শিশুসুলভ কৌতহল এবং আগ্রহ শেষ বয়ে অবধি বাবার মধ্যে ছিল বলেই ওঁর সৃষ্টির সম্ভার এত বিচিত্র। আর ছিল একটা ভীষণ খোলা মন, অটুট ধৈর্য্য, লেগে থাকার ক্ষমতা এবং খুঁটিনাটি কাজেও অসম্ভব যত্ন। অনেকেই জানেন না, প্রত্যেকটা গল্প বা উপন্যাসের খসড়া থেকে ফেয়ার করার কাজটা উনি নিজেই করতেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একটা কাহিনীর একাধিক খসড়া তৈরি করতেন। শেষের দিকে ওঁর শরীর যখন বেশ খারাপ, আমি বহুবার বলেছি, খসড়া থেকে ফেয়ার কপি আমি না হয় করে দিই। রাজি হননি। কারণ ফেয়ার করার সময়ে বহু খুঁটিনাটি পরিবর্তন উনি করতেন। সেটা অন্যের হাতে দিলে সম্ভব হবে কী করে? এত যত্ন যাঁর, তাঁর রচনা তো অন্যদের থেকে আলাদা হবেই।

পেশাদারি ব্যাপারে, অর্থাত্ টাকাপয়সার বিষয়ে বাবা চিরকালই অত্যন্ত উদাসীন ছিলেন। এক-একটা ছবির পিছনে অক্লেশে কত পরিশ্রমই না করেছেন। মনের আনন্দেই করেছেন। একটা ভালো ছবি করার পর শিল্পী হিসেবে যেটুকু মানসিক তৃপ্তি, সেটাই সব ছিল ওঁর কাছে। কাজের বিনিময়ে পয়সাকড়ি কী পাওয়া গেল সেটা নিয়ে কোনওদিনই মাথা ঘামাননি। তাছাড়া ঠিক কোন পরিচয়ে ওঁর টাকা নেওয়া উচিত হত? পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক, সংগীত পরিচালক, নাকি পোস্টার ডিজাইনার? সব মিলিয়ে ধরলে তো বিশাল পারিশ্রমিক দাঁড়ায়। কোনওদিনই তো পরিচালনার পাশাপাশি অন্যান্য কাজের জন্যে টাকাপয়সা দাবি করেননি। কোনও প্রযোজক এ বিষয়ে ভাবেননি, আজ বলতেই হয়।

কী যে সব অবিশ্বাস্য কম বাজেটে এক-একটা ছবি করেছেন, আমার তো আজকাল ভাবতেই অবাক লাগে। বাড়িতেই সাংসারিক হিসেবনিকেশ নিয়ে ভাবতেন না। টাকাপয়সার হিসেব থাকত না। কোথাও যাওয়ার হলে মায়ের কাছে গিয়ে টাকা চাইতেন। কারণ সংসারের সব হিসেব মা-ই রাখতেন বরাবর। ফেলুদাও কিন্তু পয়সাকড়ির ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন। নির্লোভ। শুধু কাজের চরিত্র নিয়ে ভাবে। প্রথমের দিকে তার দক্ষিণা হাস্যকর রকমের কম। পরে সেটা বেড়ে পাঁচশো হয়েছে, আর পরে পাঁচ হাজার। হত্যাপুরী উপন্যাসে তোপসে তো বলেই দিয়েছে, কেস জমাটি হলে রোজগার হল কি না হল সেটা ফেলুদা ভুলে যায়।

এইভাবেই চলছিল। কিন্তু ফেলুদা আর শঙ্কুর ফরমায়েশি লেখা লিখতে বাবা য়ে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, সেটা বেশ বুঝতে পারতাম। অনেক সময়ে মাথায় সে রকম প্লট আসত না, কিন্তু জোর করে লিখতে হত। তাতে লেখাটার প্রতিও সুবিচার করা যেত না। এই কথা শেষের দিকে ফেলুদার কাহিনীতে লিখেওছেন বাবা।

বাবার শরীর তখন বেশ ভেঙে পড়েছে। বসার ঘরে ওঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে আসছে। হঠাত্ উনি বললেন, ভাবছি এবার শঙ্কুকে মেরে ফেলব। বাবার মুখ থেকে যে এই ধরনের কথা কোনওদিন বেরোতে পারে, ভাবতে পারিনি। মনটা মুহূর্তেই বেশ খারাপ হয়ে গেল। চুপচাপ বসেছিলেন, কোনও কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না।বাবা সেটা লক্ষ করে বললেন, কোনও নতুন প্লট মাথায় আসছে না। বুঝতে পারছি না আর কোন নতুন জায়গায় নিয়ে গিয়ে শঙ্কুকে ফেলব। তাছাড়া শঙ্কুর বয়স হয়ে গিয়েছে, সে তো মারা যেতেই পারে।

-কিন্তু শঙ্কুর কাছে তো মিরাকিউরল রয়েছে। সে তো মরতে পারে না। আমার কথাটা শুনেই যেন সংবিত্ ফিরল বাবার। কিছুক্ষণ থেমে থেকে বিষণ্ণ গলায় বললেন, সেকথাও তো ঠিক। শঙ্কু মরতে পারে না। বাবার কাছে মিরাকিউরল ছিল না। যখন চলে যাওয়ার সময় এল, বহু চেষ্টা করেও আমরা তাঁকে রাখতে পারলাম না।

বেলভিউয়ে যখন শেষের কটা দিন কাটছে, তখন যতবারই ওঁর ঘরে ঢুকেছি, টেবিলের ওপর বই, কাগজপত্র ছড়ানো দেখে মনে হয়েছে কোনও দরকারে বেরিয়েছেন, ফিরে এসে আবার কাজে বসবেন। জীবিত অবস্থায় আর বাড়িতে ফেরা হয়নি ওঁর।

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, নার্সিংহোমে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগেই নিজের দুই প্রিয় চরিত্রকে নিয়ে কাজ উনি শেষ করেছিলেন। প্রথমটা ফেলুদার কাহিনী রবার্টসনের রুবি। দ্বিতীয়টা ইংরেজিতে, অপুকে নিয়ে জীবনের এক বিরাট পর্যায়ে গল্প, মাই ইয়ার্স উইথ অপু।

খসড়া অবস্থায় শেষ না হয়ে পড়েছিল কয়েকটা গল্পও। উনি চলে যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে রবার্টসনের রুবি এবং মাই ইয়ার্স উইথ অপুর ফেয়ার কপিগুলো খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে বুঝলাম ও দুটো চুরি হয়েছে।ওই ইংরেজি লেখাটার খসড়া থেকে বহু চেষ্টায় একটা ফেয়ার তৈরি করেন মা। সেটাই প্রকাশিত হয়েছে। খুবই আশ্চর্যের কথা, পরে আমাদের বাড়ি থকে রবার্টসনের রুবির একটা দ্বিতীয় খসড়া পাওয়া গেল। এটার থেকে সংশোধন করেই বাবা চূড়ান্ত কপিটা তৈরি করেছিলেন, যেটা চুরি যায়। এই দ্বিতীয় খসড়া তৈরির কাজটা কিন্তু শারীরিক অবনতির জন্যেই উনি বহুদিন আগে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখনও ঠিক বুঝতে পারি না, কেন ওই কাহিনীর দুটো খসড়া তৈরি করার দরকার হয়েছিল। তাহলে কি ফেয়ার কপির কাহিনীতে বড়সড়ো কোনও পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন? অন্য চেহারা পেয়েছিল রবার্টসনের রুবি?

ফেলুদার শেষ কাহিনী ঘিরে এই রহস্যটা সমাধানের অপেক্ষায় রইল।