অনাদরেও ভোট উৎসবে সামিল বাংলার শেষতম গ্রাম

89

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, আলিপুরদুয়ার :  কামাখ্যাগুড়ির মোড়ের পর সঙ্কোশ নদীর ব্রিজ পেরিয়ে যে রাস্তাটা অসমের কোকরাঝাড় জেলায় ঢুকল, সেখানে বাংলার শেষতম গ্রাম পাকড়িগুড়ি। পাশের সার্ভিস রোডে কয়েক ফুট দূরত্বের মাঝে ঘাস ও পদ্ম, দুই ফুলের পতাকা দিয়ে ছোট অস্থায়ী অফিস তৈরি। বিজেপির কাউন্টারে ছোট টিভি, সমর্থকদের দেখার জন্য। তৃণমূলের কাউন্টারের সামনে পাঁচ ছয় জনের আড্ডায় দুটো বাইক নিয়ে কৃষ্ণ সাহা এবং কাজল সরকার। এখনই উৎসব উৎসব পরিবেশ।

তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য কৃষ্ণ সগর্বে বলে ওঠেন, অন্য জায়গার মতো আমাদের এখানে পাবেন না। এই দেখুন কাজল বিজেপির সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। কাজলের মুখে লাজুক হাসি। সামান্য বাদে তিনি কৃষ্ণের সঙ্গেই বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

- Advertisement -

এই হাইওয়ের ওপর বাংলার শেষতম দোকান একটা লটারির টিকিটের। নাম রহমান লটারি সেন্টার। সেখানে কাউন্টারে বসেন বাবন দে। তাঁর বাড়ি আবার আসামের প্রথম গ্রামে। সে গ্রামের নামটাও চমৎকার– শিমুলটাপু। বাবনকে বলতে শোনা গেল, বাংলার মতো আসামে ভোট হয় না। দুটোর পরিবেশ পুরোপুরি আলাদা। আলাদা মানে কোথায় আলাদা? বাবন সহাস্য ব্যাখ্যা দেন, এখানকার মতো ওখানে নির্বাচন নিয়ে এত আলোচনা হয় না।

তুলনাটা এ ভাবেই নানা দিক থেকে বারবার চলতে থাকে অসম-বাংলা সীমান্তের এই হাইওয়েতে। দুটো রাজ্যেই একসঙ্গে নির্বাচন চলছে বলে হয়তো আরও বেশি তুলনা হতে বাধ্য।

অসম-বাংলা সীমান্তে বড় রাস্তা বলতে দুটো। প্রথমটা আলিপুরদুয়ারে, দ্বিতীয়টা কোচবিহারে। আলিপুরদুয়ার দিয়ে আসামে ঢুকলে প্রথম বড় গঞ্জ মতো জায়গাটার নাম শ্রীরামপুর। দুটো বিশাল শিরীষ গাছের নীচে ছোট ছোট কয়েকটা দোকান। আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানদার হবিবুর রহমান স্পষ্ট বাংলায় মন্তব্য করলেন, আমাদের ভোটটা যাবে কংগ্রেসের জোটে। আলিপুরদুয়ারের কাছের শহর বারোবিশা থেকে প্রতিদিন তরকারি কিনে এনে অসমে নিজের গ্রামে বেচেন হাফিজুদ্দিন। হবিবুরের মতো তাঁরও পিতৃপুরুয় আসামের এই এলাকার লোক। তিনিও সামান্য বাদে বাংলায় শোনালেন, তাঁর ভোটও যাবে কংগ্রেসে।

বহুদিন পরে কোনও ভোটারের মুখে শোনা গেল, কংগ্রেসের কথা। পাহাড় এবং ডুয়ার্সে যা শোনাই যায় না। ডুয়ার্সে সব গ্রামেই এখন খেতে বা বাগানে উড়ছে পদ্মফুল বা ঘাস ফুলের পতাকা।

সীমান্ত বড় জটিল জায়গা এই অঞ্চলে। বিভাজনের সরলরেখা বলে আদৌ কিছু হয় না। সঙ্কোশ নদীটা যেমন মাঝে মাঝে আসামের হয়ে গিয়েছে, মাঝে মাঝে বাংলার। আবার কোথাও সটান সীমান্তেরই কাজ করেছে এ নদী। অসমের লোকে একে বলেন গঙ্গাধর নদী। বাংলায় সঙ্কোশ। কুমারগ্রাম পেরিয়ে আবার সঙ্কোশ নামে একটা চা বাগানও রয়েছে। জায়গাটার নামও সঙ্কোশ। আলিপুরদুয়ার থেকে অসমের দিকে এগোতে গেলে, হঠাৎ ব্রিজের মুখে এক টুকরো অঞ্চলে হাজির হয় কোচবিহার জেলা। নাকা চেকিংগুলো সব ওই অংশে।

এই আঁকাবাকা নদীর জন্য আবার গণ্ডগোলও। সীমান্তে নদী থাকলে এমনিতেই বহু জটিলতা। পাকড়িগুড়িতে বিজেপি বুথের সামনে দাঁড়িয়ে বিজেপির নেতা গোপাল দাস গলা তুললেন, গরু পাচারের পাশাপাশি এখন মুরগি পাচার প্রচুর চলছে অসমে। বড় রাস্তা দিয়ে গেলে ধরা পড়ে যেতে হবে। তাই নদীতীরের গ্রামগুলোর ভিতর দিয়ে চলছে অবাধ পাচার।

মুরগির অসুখ নিয়ে বড় ঝামেলা চলছে অসমে, তাই সেখানে আমদানি বন্ধ। কে আটকাবে পাচারকারীদের? সমর্থনসূচক ঘাড় নাড়া ভিড়ের মধ্যে কে একজন বলল, অসমের কোন একটা থানায় এমন বেআইনি গরু অজস্র আটকে রাখা রয়েছে। জায়গা নেই। স্পষ্ট বোঝা যায়, পাকড়িগুড়ি গ্রামে বিজেপি সমর্থকরা আক্রমণাত্মক অনেক বেশি। আত্মবিশ্বাসীও। বাতাসে জেগে রয়েছে পদ্মগন্ধ। গ্রামের বিধানসভা কেন্দ্র কুমারগ্রামেও সেই গন্ধ উড়ছে দেখে এলাম।

শিলিগুড়িতে মহানন্দা, তিস্তা, বালাসনে বালি ও পাথরকুচি বেআইনি চুরি নিয়ে বাংলাশুদ্ধু লোক জেনে গিয়েছেন। বেশি লোক যা জানেন না, তা বলতে চান বাংলার শেষ গ্রামের অধিবাসীরা। সঙ্কোশ এবং রায়ডাক নদীর বুকে এই কাজটা আরও বিশ্রী ভাবে হচ্ছে। সব পাথরকুচি নদীর বুক থেকে সটান চলে যাচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। এ অঞ্চলের মানুষদের অসম্ভব গর্ব, দুটি নদীর পাথরকুচি নিয়ে রোদ পড়লে অনেক বেশি ঝকঝক করে ওঠে এই বালি, এই পাথরকুচি।

অসম ও বাংলার শেষ প্রান্তে পড়ে থাকা কোকরাঝাড় ও আলিপুরদুয়ার জেলার দুটো গ্রাম কোথাও গিয়ে যেন মিলে যায় নির্বাচনের আগে। উপেক্ষায়, অনাদরে। পাকড়িগুড়ির কথাই ধরা যাক। এখনও সঙ্কোশ ব্রিজ পেরিয়ে রেশন নিতে যেতে হয় ওপারে। পোস্ট অফিস, ব্যাঙ্কও তাই। বছর দুই আগে রেশন নিতে নৌকোয় নদী পেরোতে গিয়ে ডুবে মারা যান এক মহিলা। পাকড়িগুড়ির একটু আগে লাগোয়া দুটি গ্রাম মাজেরদাবড়ি ও বারুইপাড়া। বারুইপাড়া একটু বড়, পোস্ট অফিসটা সেখানে, নদীর দুপারেই জেগে অস্তিত্ব। তিন গ্রামেই অনাদরের এক ছবি।

আপনাদের এখানে কোনও বড় নেতা এসেছিলেন ভাষণ দিতে? তৃণমূল বা বিজেপি সমর্থকদের ভিড়ে দুবার প্রশ্নটা করে দেখলাম, কৃষ্ণ বা গোপাল কোনও নাম বলতে পারছেন না। সেই প্রত্যাশা বা ক্ষোভও তাঁদের আছে বলে মনে হল না। ধরে নিয়েছেন, রাজ্য স্তরের নেতারাও এতদূরে আসবেন না। যাঁদের টিভিতে দেখা যায়, সেই তার্কিক নেতারাও না। পাকড়িগুড়িতে দুটো বুথ। পাকড়িগুড়ি এসসি প্রাইমারি স্কুলে ভোটার ৮০৫। উত্তরপাড়া প্রাইমারি স্কুলে ১০১৪। বারুইপাড়ায় দুটো বুথ। মাজেরদাবড়ি হাই স্কুলে ৬৩৭ ভোটার, নিম্ন বুনিয়াদি প্রাইমারি স্কুলে ১০৩৮। মাঝেরদাবড়িতে দুটো বুথে ভোটার ১৩৮৯। এত কম ভোটারের জন্য কি এখন বড় নেতারা আসবেন বাংলার শেষতম গ্রামে? অর্থনীতির তত্ত্ব নিয়ে মাথাব্যথার প্রশ্ন আসে না।

শিল্প নেই। নদীতে বেআইনি পাথরভাঙা ব্যবসা আছে। বিজ্ঞানসম্মত কৃষি নেই। কিছু টিনের ছাদওয়ালা দোকান রয়েছে। হাসপাতাল নেই। রয়েছে পাকা রাস্তা। সেটাই কি অনেক? অনাদরের চাদরে ঢাকা পড়েও বাঙালির ভোটের উৎসবে আনন্দে কৌতহলের মুখ বাড়াচ্ছে বাংলার শেষতম গ্রাম পাকড়িগুড়ি।