ক্যারাটের কিট ফেলে কুরিয়ারের ব্যাগ স্মৃতিকণার কাঁধে

995

দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: রায়গঞ্জ শহরে একজন অল্পবয়সি মেয়েকে সাইকেলে চেপে পার্সেলের ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে দেখে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। তিনি স্মৃতিকণা কুন্ডু। ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট। জাতীয়স্তরে ক্যারাটে প্রশিক্ষকের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাঁকেই এখন ক্যারাটের কিট ফেলে কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে কুরিয়ারের ব্যাগ। যে হাতে ক্যারাটের পাঞ্চ দিতেন সেই হাত এখন বয়ে বেড়াচ্ছে কুরিয়ারের পার্সেল। রায়গঞ্জের মেয়ে স্মৃতিকণা। ইচ্ছে ছিল ক্যারাটে শিখে ভালো জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবেন। অল্পবয়সেই ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট পান। জাতীয়স্তরে ক্যারাটে প্রশিক্ষকের কোচিং নিয়ে ক্যারাটের প্রশিক্ষণ দেওয়াও শুরু করেন। কিন্তু করোনা আর লকডাউন তাঁর জীবনটাকেই পালটে দিয়েছে। লকডাউনে মায়ের শাড়ির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বন্ধ ক্যারাটের প্রশিক্ষণও। তাই সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনা, ক্যারাটে সব ছেড়ে স্মৃতিকণা বেছে নিয়েছেন কুরিয়ার সার্ভিসের কাজ। এজন্য সাইকেলই তাঁর একমাত্র ভরসা।

এখন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত রায়গঞ্জের পাড়ায় পাড়ায় চিঠি ও পার্সেল বিলি করেন স্মৃতিকণা। বাড়িতে রয়েছেন মা লক্ষ্মী কুন্ডু ও ভাই দীপ কুন্ডু। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের বাসিন্দা লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর অনেকদিন আগে বিচ্ছেদ ঘটে। দুই শিশুসন্তান নিয়ে লড়াইটা শুরু হয় তখনই। ছেলেমেয়েকে বালুরঘাটে মামাবাড়িতে রেখে দিল্লিতে গিয়ে কাজ শুরু করেন লক্ষ্মীদেবী। ২০১৮ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন স্মৃতিকণা। ২০১৯ সালে তাঁর ভাই দীপও মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়।

- Advertisement -

গত বছর স্মৃতিকণা ও দীপ দুজনেই ইটাহারের সরকারি পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হন। রায়গঞ্জে এসে দুই ভাইবোন বাড়ি ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে লক্ষ্মীদেবীও জানুয়ারি মাসে রায়গঞ্জে চলে আসেন। এখানে জামাকাপড়, শাড়ির ব্যবসা করে ভালোমতোই সংসার চালাচ্ছিলেন। কিন্তু বাধ সাধে লকডাউন। কী করবেন ভেবে কিনারা পাচ্ছিলেন না। ধীরে ধীরে বাড়ি ভাড়া, সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে ঘরে জমানো সামান্য পুঁজিও শেষ হয়ে যায়। দুবেলা ভাত জোগাতে কাজ খোঁজা শুরু করেন স্মৃতিকণা। রায়গঞ্জের মতো ছোট শহরে কাজ পাওয়া সহজ নয়। তাও এই করোনা পরিস্থিতিতে।

শেষ পর্যন্ত স্মৃতিকণা সংসারের হাল ধরতে মাস তিনেক হল কুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ নেন। পড়াশোনায় ছেদ পড়ে তাঁর ও ভাইয়ে। কিন্তু নিজের পায়ে যে দাঁড়াতেই হবে। তাই কাজের ফাঁকে পড়াশোনাটা ধরে রাখতে জেনারেল লাইনে ফের পড়া শুরু করতে চান তাঁরা। কারণ, অর্থনৈতিক সমস্যার কাছে হেরে গিয়ে স্মৃতিকণা বুঝে যান পলিটেকনিকে পড়া তাঁদের ভাইবোনের পক্ষে হয়ে উঠবে না। কিন্তু একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য রায়গঞ্জের বিভিন্ন স্কুলে ঘুরলেও কেউই তাঁদের ভর্তি নিতে চাইছে না। কারণ তাঁরা কেউই চলতি শিক্ষাবর্ষের পড়ুয়া নন। এই অবস্থায় স্মৃতিকণা চাইছেন, কেউ একটু পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন।

লক্ষ্মীদেবী বলেন, এই অচেনা শহর রায়গঞ্জে কেউ এগিয়ে এসে আমাকে অন্তত একটা চা, রুটি, টিফিন বিক্রির জায়গা করে দিন। আমি সৎভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই। আর আমার দুই সন্তানকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিন। ওদের দুজনকে একাদশে ভর্তি করতে গিয়ে স্কুলে স্কুলে ঘুরে ঘুরে আমি ক্লান্ত। কুরিয়ার সার্ভিসে কর্মরত কর্মীরা কিন্তু স্মৃতিকণা মতো লড়াকু মেয়েকে সহকর্মী হিসাবে পেয়ে গর্বিত। ইতিমধ্যেই রায়গঞ্জের বেশ কিছু এলাকায় ডেলিভারি গার্ল স্মৃতিকণাকে চিনে ফেলেছেন অনেকেই।

স্মৃতিকণা বলেন, ক্যারাটে নিয়ে স্বপ্ন ছিল অনেক। লকডাউনে আয়ের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। মায়ের অনলাইনে  শাড়ির ব্যবসা ছিল। কিন্তু লকডাউনে সেই ব্যবসা এখন বন্ধ। আমিই তো পরিবারের ভরসা। কোনও কাজই ছোট নয়। তবে দুঃখ হয় তখন, মানুষ যখন বাজে কথা বলেন। আমরা দুই ভাইবোন পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু আমি ২০১৮ সালে ও ভাই ২০১৯ সালে মাধ্যমিক পাশ করায় কোনও স্কুল আমাদের ভতি র্নিতে চাইছে না। কেউ যদি এগিয়ে আসেন তাহলে আবার মূলস্রোতে ফিরতে পারতাম।